দ্য ডেঞ্জারাস!

Arfin Rupok
  • প্রকাশিত সময় : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • শেয়ার করুন

  • Facebook

ওল্ড ট্রাফোর্ড থেকে রোজ বোল; মাঝখানে ২৫৩ টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে নিজের উপস্থিতি। ৮৭৩৯ বলের মোকাবিলায় নামের পাশে যুক্ত করেছেন ৭৮৪১ রান। ১১ সেঞ্চুরির সাথে ৪৬ ফিফটি; ইংল্যান্ডের পক্ষে দ্রুততম ওয়ানডে সেঞ্চুরিয়ান! তিনি ঠান্ডা মাথার খুনি, তিনি হার্ডহিটার, তিনি ডেঞ্জারাস; তিনি জোসেফ চার্লস বাটলার।

২০১১ সাল; শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে টি-২০ ম্যাচের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাত্রা শুরু। অভিষেকের পর ১০ ম্যাচে ৩৬ রান! আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যাত্রা এখানেই শেষ হবার কথা! কিন্তু না, শেষ হয়েও হয়নি শেষ। কেননা সকালের হাসিমাখা সূর্য কখনো দিনের সঠিক পূর্বাভাস দেয়না। ঠিক তেমনি বাটলারের গল্পটিও তেমনি। প্রথম ১০ টি-২০ ম্যাচে ৩৬ রান করা সেই বাটলার আজ ইংল্যান্ডের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন। শুরুর ব্যর্থতা চাপা পড়ে নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে ১৪৫৫ রান! যেখানে ব্যাটিং গড় ২৮.৫৩, রয়েছে ৯ টি ফিফটি। সর্বোচ্চ রান অপরাজিত ৭৭। এখানেই শেষ নয়…

  • টি-২০ ক্রিকেটে মিনিমাম ১০০০ রান করা ব্যাটসম্যানদের মাঝে ১৪০.৩১ স্ট্রাইকরেটে রান করে রয়েছেন ১১ নাম্বারে। ইংল্যান্ডের পক্ষে দ্বিতীয় স্থানে।
  • ইংল্যান্ডের পক্ষে উইকেটরক্ষক হিসেবে সর্বোচ্চ ডিসমিশালের মালিক বাটলার।
  • ৩ বার হয়েছেন ম্যাচ সেরা। মজার বিষয় হলো ৩২ রান করেও ম্যাচ সেরা হবার রেকর্ড রয়েছে তার।

গল্পটা ওয়ানডে ক্রিকেটের!
ডুবাই – লর্ডস; ০ – ৫৯। মাঝখানে ১৪০ ম্যাচ; ৩৭৮৪ রান, ৯ সেঞ্চুরি, ২০ ফিফটি। যার মাঝে রয়েছে ৪ টি ৯০+ রানের ইনিংস। পাকিস্তানের বিপক্ষে ডাক দিয়ে শুরু, সেই পাকিস্তানের বিপক্ষেই মাত্র ৪৬ বলে সেঞ্চুরি করে বনে গেছেন ইংল্যান্ডের পক্ষে দ্রুততম সেঞ্চুরিয়ান। এখানেই শেষ নয়! রয়েছে ৫০, ৬১ এবং ৬৬ বলের মোকাবিলায় সেঞ্চুরি। কিন্তু তিনি ক্রিস গেইল, ড্রে রাসদের মতো মারমুখী তকমা পাননি। তাতে কি? ইতিহাস বুকে নিজেকে ঠিকই নিয়েছেন। ওয়ানডে ক্রিকেটের গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারতো! কিন্তু তা আর হলো কই? পরিসংখ্যান ঘাঁটতে গেলে বেরিয়ে আসলো বেশকিছু রেকর্ড। এবার সেই রেকর্ডগুলোতে একটু নজর দেওয়া যাক!

  • ওয়ানডে ক্রিকেটে মিনিমাম ৩০০০ রান করা ব্যাটসম্যানদের মাঝে সর্বোচ্চ স্ট্রাইকরেটে(১১৯.৮৩) রান করা ব্যাটসম্যান বাটলার।
  • ইংল্যান্ডের পক্ষে সর্বোচ্চ ৩ বার একই ম্যাচে ৫০+ রান এবং কিপিংয়ে ৪+ ডিসমিশাল করার রেকর্ড বাটলারের দখলে।
  • ওকসের বোলিংয়ের বিপরীতে কিপিংয়ে ২৬ ক্যাচ নিয়েছেন তিনি।
  • আদিল রশীদের সাথে ৭ম উইকেটে রেকর্ড ১৭৭ রানের জুটি গড়েছেন বাটলার।
  • ওয়ানডে ক্রিকেটে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়েছেন ১১ বার।
  • ইংল্যান্ডের পক্ষে এক ইনিংসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছক্কা(১২ টি) মেরেছেন বাটলার।

ক্রিকেটের রাজকীয় ফরম্যাটে বাটলারের গল্প:
রোজ বোল – রোজ বোল; ভারত – পাকিস্তান! সর্বমোট ৪৭ ম্যাচে খেলা হয়েছে বাটলারের। যেখানে ২৫৪৩ রান সংগ্রহ করেছেন ৩৩.৯১ গড়ে। ২ শতকের সাথে রয়েছে ১৭ অর্ধ-শতক। ঠান্ডা মাথার খুনি এই ফরম্যাটে মিডল-টেলএন্ডারদের নিয়ে অনেকটা ঠান্ডা মেজাজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। অভিষেক ম্যাচে ফিফটি দিয়ে শুরু এবং সর্বশেষ ম্যাচে খেলেছেন টেস্ট ক্যারিয়ারে নিজের সেরা ইনিংস। এভাবেই নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন প্রতিটি ম্যাচেই। তিনি এখন ইংল্যান্ডের সেরা একজন পারফর্মার। তিনি মি. ডেঞ্জারাস।


ডেঞ্জারাস এই ব্যাটসম্যান উইকেটের চারদিকে শট খেলতে পারদর্শী। দলের প্রয়োজনে কখনো ওপেনিংয়ে আবার কখনো ৭/৮ এ খেলে থাকেন। দল চাইলে ২০০+ স্ট্রাইকরেটে তুলতে পারেন রান! আবার পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিয়ে খেলতে পারেন ম্যাচ উইনিং ইনিংস। ক্রিকেটের ২২ গজে একবার দাঁড়িয়ে গেলে তাড়াহুড়ো ছাড়াও তুলতে পারেন দ্রুত রান! কিছুটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও বাটলার এমনি। রয়েছে আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে দ্বিতীয় দ্রুততম ১৫০ রানের রেকর্ড! কিন্তু তাকে দেখে মনে হবেনা যে সে এতো দ্রুত রান তুলতে পারেন! স্পিন কিংবা ফাস্ট; জায়গায় দাঁড়িয়ে নিমিষেই করেন সীমানা ছাড়া। আবার কখনো স্কুপ করে তাক লাগিয়ে দেন দর্শকদের। যদি বলি বাটলার ক্রিকেটের সৌন্দর্য! তাহলেও হয়তোবা ভুল হবেনা আমার।

তবে এই বাটলারের গল্পটা ভিন্ন হতে পারতো! ২০১৫ বিশ্বকাপে ক্যাচ প্র্যাকটিস করিয়ে আউট হওয়াটা হয়তোবা বাটলারকে বদলে দিয়েছে; সেদিনের সেই হারের ক্ষত কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলেছে বাটলারকে। আসলে সফল মানুষেরা পিছনের ভুল নিয়ে ভাবেন না, সেই ভুল থেকে কিভাবে বেরিয়ে আসতে হয় সেই উপায় খুঁজে বের করেন। বাটলার ঠিক এমনি, সেই ভুলের পর যেনো বাটলার বদলে গেছেন, ধারণ করেছেন ভয়ংকর রূপ। আর এতেই আজ তিনি বিশ্বের সেরা হার্ডহিটারদের একজন। তিনি বিশ্বের ক্লাসিক ব্যাটসম্যানদের একজন। তিনি সফল ব্যক্তিদের একজন। তিনি চ্যাম্পিয়ন!


এই বাটলারের শুরুর গল্প কেমন ছিলো! জানতে কি ইচ্ছে করে? আচ্ছা আসুন, সেই শুরুর বাটলারকে জানার চেষ্টা করি।

বর্তমান সময়ে বিশ্বের সেরা মারকাটারি ব্যাটসম্যান সেই ছোট বেলা থেকেই ছিলেন প্রতিভাবান একজন ক্রিকেটার। বেশীরভাগ সময়ই ক্রিকেট নিয়ে পড়ে থাকা ছেলেটি স্কুল জীবনে দারুণ ব্যাটিং পারফরম্যান্স করে নজরে আসেন শিক্ষকদের। স্কুল ক্রিকেটে দারুণ পারফর্ম করা ছেলেটির সুযোগ হয় অনূর্ধ্ব ১৩, ১৫, ১৭ দলের হয়ে খেলার। সেখানে নিয়মিত খেলতে থাকেন তিনি। এরমাঝে ২০০৯ সালে সুযোগ হয় প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট মাতানোর। এভাবেই চলতে থাকে বাটলারের এগিয়ে যাওয়ার মিশন!

সময়টা ২০১০ সাল;
বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে ৫৫ গড়ে ৪৪০ রান সংগ্রহ করেন বাটলার। যার পুরষ্কার স্বরূপ তাকে উইসডেনের স্কুল ক্রিকেটে সেরা ব্যাটসম্যান ঘোষণা করা হয়। সেই সাথে সুযোগ হয়ে যায় ইংল্যান্ডের জার্সিতে অনূর্ধ্ব ১৯ দলে খেলার। সেখানে দারুণ ব্যাটিংয়ে নজরে আসে বাটলার। এরপরেই জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানোর সুযোগ মেলে তার। এই ছিলো বাটলারের ছোট বেলা থেকে বিশ্ব ক্রিকেটে আসার গল্প…


জস বাটলার; অন্যান্য হার্ডহিটার ব্যাটসম্যানদের মতো এলোপাথাড়ি ব্যাট না চালিয়েও দ্রুতগতিতে রান তোলায় মন জয় করেছেন কোটি ক্রিকেট ভক্তের। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ওয়ানডে এবং টি-২০ ফরম্যাটে শুরুটা হ-য-ব-র-ল হলেও মানিয়ে নিয়েছেন খুব দ্রুত। ঠিক তেমনি ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলে মন জয় করে নিয়েছেন ক্রিকেট ভক্তদের, নিজেকে নিয়ে যাচ্ছেন অনন্য এক উচ্চতায়।

ব্যাটিং পজিশন যেমনই হোক! দল কি চায় সেটা দিয়ে থাকেন বাটলার। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো তাড়াহুড়ো ছাড়াও দলের রানকে খুব তাড়াতাড়ি বাড়িয়ে নিতে পারেন তিনি। তাইতো তাকে সাইলেন্ট ফিনিশার বললেও বলা যায়! আর এই বদলানোর পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ২০১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে সেই ম্যাচটি। যেই ম্যাচে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিলো। কিন্তু সেদিনই যে নতুন ইংল্যান্ড বা নতুন বাটলারের জন্ম হবে সেটা হয়তো কেউ কল্পনাতেও ভাবেননি। কেউ ভাবলে বা না ভাবলেই কি আসে-যায়? বাটলার নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন হয়তো!

বাটলারকে নিয়ে বলতে গেলে বলতে হয় অনেক কিছু; বলতে হয় স্বপ্নের ফাইনালে গাপটিলকে রান আউট করে উল্লাসে মেতে উঠার গল্প! কিংবা পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রায় হেরে যাওয়া ম্যাচে ইংল্যান্ডকে জয় এনে দেওয়ার গল্প। আসলে এইসব গল্পের রচিয়তাকে নিয়ে লিখতে হবে অনেক কিছুই। সবটা আর লিখে শেষ করা সম্ভব নয়!

এই বাটলার ১৯৯০ সালের আজকের দিনে সামারসেটের টাউনটনে জন্মগ্রহণ করেন। যার মানে আজ বাটলারের জন্মদিন। আজকের এই শুভ দিনে বাটলারকে জানাই জন্মদিনের শুভেচ্ছা। শুভ জন্মদিন বাটলার।

 

মন্তব্য করুন

এই বিভাগের আরো খবর