Cricketkhor

"ডাল ভাতের সাথে ক্রিকেট খাই,
টাইগারদের জন্য গলা ফাটাই"

সৌম্যর অধ্যায়ের শেষ এখানেই

Musaddik Mitu

Musaddik Mitu

সৌম্য সরকার মুখটা সবারই চিনা। বারবার ব্যর্থ হওয়ার পরেও সুযোগ পেয়েছেন বারবার। ক্রিকেট প্রেমীদের কাছে তিনি একটা হতাশা একটা দীর্ঘশ্বাস। ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ণ করে এবার তিনি সব ফর্মেট থেকে জায়গা হারাচ্ছেন। যেটা কি তার প্রাপ্য?

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেক হয় তার। অভিষেক ম্যাচে শর্ট বলে দৃষ্টিনন্দন আপারকাট খেলে ক্রিকেট প্রেমীদের মনে কিছুটা হলেও জায়গা করে নেন সৌম্য। মাত্র এক ম্যাচের অভিজ্ঞতা দিয়ে পেয়ে যান ওয়ানডে বিশ্বকাপের স্কোয়াডে। ব্যাটিংয়ে পেস এবং শট বলে পারদর্শীতা দেখে তৎকালীন বাংলাদেশ কোচ চান্দ্রিকা হাথুরুসিংহা কিছুটা মুগ্ধ হোন তার প্রতি। ওয়ানডে বিশ্বকাপে ‘তরুণ’ সৌম্য আহামরি না করলেও দলের ক্রুশাল মোমেন্টে বেশ কিছু কার্যকরী ইনিংস খেলেন সৌম্য। ২০১৫ বিশ্বকাপে প্রায় ৩০ গড়ে রান করে সৌম্য।

বিশ্বকাপ শেষ করে ঘরের মাঠে ফিরেন সৌম্য। নিয়মিত ওপেনার এনামুল হক বিজয় ইঞ্জুরিতে পড়ায় ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওপেনিংয়ে সুযোগ পান সৌম্য। সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে রান বেশী রান করলেও সহজাত আক্রমনাত্মক ব্যাটিং করেন সৌম্য। শেষ ওয়ানডে ম্যাচে পেয়ে যান কাঙ্ক্ষিত প্রথম ওয়ানডে শতক। এরপর ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে ফিফটি এবং বাকি দুইটায় ত্রিশউর্ধ ইনিংস খেলেন। পরের সিরিজ দক্ষিন আফ্রিকার বিপক্ষে। প্রথম ওয়ানডেতে হারে বাংলাদেশ। শেষ দুই ওয়ানডে ম্যাচে দলকে একাই জেতান সৌম্য। দুই ৮০+ ইনিংস খেলে প্লেয়ার অফ দ্যা সিরিজও হোন সৌম্য। ওয়ানডেতে তার ক্যারিয়ারের সেরা সময় ছিল ২০১৫ সাল। ওই বছর ১৫ ম্যাচে ৫১.৬৯ গড়ে ৬৭২ রান করেন, ফিফটি ৪টি সেঞ্চুরি ১টি। আর স্ট্রাইক রেট ছিল ১০২।

এরপর ওয়ানডে ম্যাচ না থাকলেও টি-টোয়েন্টি দলে ওপেনার হিসেবে জায়গা পান সৌম্য। ২০১৬ সালে টি-টোয়েন্টিতে বলার মতো পারফরম্যান্স করেন শুধু এশিয়াকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে। ওই ম্যাচে ম্যাচসেরার পুরষ্কার জিতেন সৌম্য। এশিয়াকাপ-১৬ এবং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ-১৬ তে পুরোটাই ব্যর্থ ছিলেন বামহাতি এই ওপেনার। হিটিং এবিলিটি আর কোচের পছন্দের কারনে নিয়মিত সুযোগ মিলতে থাকে সৌম্যর। কিন্তু ব্যর্থতা যেন পিছনই ছাড়ছিল না সৌম্যর।২০১৬ সালে টি-টোয়েন্টিতে ১৬ ম্যাচে প্রায় ১৬ গড়ে ২৫৫ রান করেন তিনি। স্ট্রাইক রেট ছিল মাত্র ১০৬। কোনো ফিফটি নাই।

২০১৭ সালে ওয়ানডেতে পুরোটাই ব্যর্থ। তবে টেস্টে ধারাবাহিক ভাল করেন সৌম্য। ২০১৭ সালে ৭ টেস্টে ৩২.২১ গড়ে ৪৫১ রান করেন সৌম্য, ৮৬ রানের সর্বোচ্চ ইনিংসটি এসেছিল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। ওয়ানডেতে ব্যর্থ সৌম্য তখন টি-টোয়েন্টিতেও ধারাবাহিক ছিলেন। ২০১৭ সালে ৭ ম্যাচে ৩৩.৫৭ গড়ে ২৩৫ রান করেন সৌম্য, সর্বোচ্চ ৪৭ রানের ইনিংস আসে দক্ষিন আফ্রিকার বিপক্ষে। টি-টোয়েন্টিতে ওই বছর দেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রানের মালিক ছিলেন সৌম্য। ওয়ানডে ফর্মেটে ২০১৫ সাল তার পিক টাইম হলেও টেস্ট এবং টি-টোয়েন্টিতে তার পিক টাইম ছিল ২০১৭ সালই।

২০১৮ সালের আগে তৎকালীন কোচ চান্দ্রিকা হাথুরুসিংহা পদত্যাগ করেন। কোচের বিদায়ের পরে ওয়ানডেতে বারবার ব্যর্থত হওয়ার ফল স্বরুপ জায়গা হারান ওয়ানডে, টেস্ট দল থেকে। শুধুমাত্র টি-টোয়েন্টি দলে জায়গা থাকে তার। তবে ওই বছর মাত্র ১২ গড়ে টি-টোয়েন্টিতে রান করেন সৌম্য। তিন ফর্মেটে ধারাবাহিক ভাবে খারাপ খেলা শুরু করেন ২০১৮ সালের শুরু থেকেই। বাকি ওপেনারদের ব্যর্থতা আর ঘরোয়া কিছুটা পারফর্ম করার কারনে আবারো ওয়ানডে দলে ফিরেন সৌম্য। ২০১৮ সালের এশিয়াকাপ থেকে ২০১৯ বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত ওয়ানডেতে ১১ ম্যাচ খেলে ৪টি ফিফটি ও ১টি সেঞ্চুরি করে ২০১৯ বিশ্বকাপ দলে ওপেনার হিসেবে জায়গা করে নেন সৌম্য।

২০১৯ বিশ্বকাপ! প্রথম ম্যাচে দক্ষিন আফ্রিকার বিপক্ষে ৩০ বলে ৪২ রান। এরপরে আর ৪০ উর্ধ রান আসেনি একটাতেও। পুরো বিশ্বকাপ শেষ করেন ব্যর্থতার মায়াজালে। ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে মাত্র ২২ গড়ে ২৩০ রানের মতো করেন সৌম্য। এখান থেকে আর কামব্যাক করা হয়নি সৌম্যর। এর পরে দলের সাথে থাকলেও কখনো ওপেনিং, কখনো নাম্বার থ্রি, কখনো বা ফিনিশার হিসেবে খেলে গেছেন। তবে ব্যাট হাসেনি তার।

ক্যারিয়ার স্ট্যাট দেখলে ক্রিকেট প্রেমীরা একটা দীর্ঘস্বাস ফেলবেন! তার পর কষ্টে মনের মধ্যে থেকে কিছু শব্দ ভেসে উঠবে। সৌম্য কেন এমন করলো? কি অপরাধ করেছিলেন আমরা তাকে নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখে? কেন এত আশার আলো দেখিয়ে বাইশ গজে পা রেখেছিলেন? উত্তরটা হয়তো কারোরই জানা নেই, সৌম্য নিজেও হয়তো এই জবাব দিতে পারবেন না এই প্রশ্নগুলোর। ক্যারিয়ার স্ট্যাট দেখে নিজেও হয়তো মুখ লুকিয়ে কাঁদবেন, আর নিজেকে বারবার বলবেন যদি একটু মাথা খাটিয়ে খেলতাম, নিজের ক্যারিয়ার আর দলের স্বার্থে একটু সিরিয়াস থাকতাম তাহলে ক্যারিয়ারটা কোনো বড় প্লেয়ারের মতো শেষ করতাম।

সৌম্যর কিছু টেকনিক্যাল প্রব্লেম:- (একান্তই আমার পর্যালোচনা থেকে)।

কোথাও একটা শুনেছিলাম ‘ক্রিকেট ইটস আ গেইম অফ ফুটওয়ার্ক’। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যার ফুটওয়ার্ক যত ভাল তার সাফল্যও বেশী। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই সৌম্য ফুটওয়ার্ক করে খেলায় বিশ্বাসী ছিলেন না। এইটা এই কারনে বলতে বাধ্য হচ্ছি কেননা তার এই ফুটওয়ার্ক প্রব্লেম নিয়ে কখনো কাজ করতে কিংবা এটা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কথা বলতে শুনি নাই। স্পিন বল দেখলেই সৌম্যর পা কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়ে যেত/যায়। এটা ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তার সমস্যা ছিল। ক্যারিয়ারের শুরুতে স্পিন বল খেলতে পারেন না এই কথা যেন কানে না আসে সেজন্য স্পিন বলে প্রায়ই কাউন্টার এটাক করতে দেখা যেত থাকে। ক্যারিয়ার ঘাটলে দেখা যাবে পেস বল থেকে স্পিনেই তার ছক্কার সংখ্যা বেশী। এটা শুধু নিজেকে ভিতু প্রমান না করতেই করতেন তিনি।

পেস বলে সাবলীল ছিলেন সৌম্য? আপনি যদি সৌম্যর হেটার্সও হোন তার ব্যাটিং দেখলে হয়তো বলবেন সৌম্য পেস বল ভাল খেলে। এতটুকুর সাথে আমিও কিছুটা একমত। তবে সৌম্য পেস বলে ভাল এটা বলবো না তবে কিছুটা সাবলীল ছিলেন বলবো। উদাহরণ দিব? তাহলে শুনেন। সৌম্যর স্ট্রেংথ ছিল সে জায়গায় দাড়িয়ে বাউন্ডারি হাকাতে পারতো। এই ট্যালেন্ট সত্যিই প্রশংসার মতো ছিল, তবে সৌম্য তার এই শক্তি নিয়ে কনফিডেন্ট না ওভার কনফিডেন্ট ছিলেন। বেশীদূরে না ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপেই দেখুন। খেলা ছিল ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে যেখানে স্পিনারদের বলে টার্ন হয়না শুধু লাইন লেন্থের উপর ভরষা রাখতে হয়। ইংল্যান্ডের কন্ডিশন পেসারদের জন্য আদর্শ। এমনটা হলে সৌম্য এই কন্ডিশনে বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান হওয়ার কথা। কিন্তু তিনি কি হতে পেরেছিলেন? অবশ্যই না। ৮ ম্যাচের ৬ ম্যাচেই তিনি আউট হয়েছিলেন পেসারদের বিপক্ষে। রান করেছেন মাত্র ২২ গড়ে।

আরেকটু লম্বা করে বললে বলতে হবে সৌম্য পেস বলেও উইক ছিলেন তার পায়ের সমস্যা অর্থাৎ ফুটওয়ার্কের কারণে। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচই দেখুন ক্রিস মরিসের লেগ স্ট্যাম্পের বাইরের বলটা পা একটু অফ স্ট্যাম্পের দিকে নিয়ে ফাইন লেগ দিয়ে উড়িয়ে মারার কথা (যেটা বেসিক ক্রিকেট বলে)। কিন্তু সৌম্য কি করলেন? কোনো রকম পাঁয়ের মুভমেন্ট না করিয়ে জায়গায় দাড়িয়ে বলটা উড়িয়ে মারতে গেলেন, ফলস্বরূপ বলটা নিজের গাঁয়ে (মূলত গ্লাভসে) গেলে উপরে উঠে যায় পরে উইকেট কিপার সেটা নিজের গ্লাভস বন্ধি করেন। খালি চোখে এভাবে যদি পর্যালোচনা করেন তাহলে বুঝবেন সৌম্য ফুটওয়ার্কের ব্যবহার না করার কারনে প্রায় সব ম্যাচেই আউট হয়েছেন। এটা ছাড়াও তার আরো কিছু সমস্যা ছিল। যেমনঃ- জায়গায় দাড়িয়ে তিনি ক্রশ শট খেলতে যেতেন, কোনো রকম ফুট মুভমেন্ট না করে পুল, হুক করতেন যেটার জন্য অনেক ম্যাচেই তিনি বল আকশে উঠিয়ে ক্যাচ দিয়ে ফিরতেন। স্ট্যাট ঘাটাঘাটি করলে বুঝতে পারবেন সৌম্য বোল্ড কিংবা এলবিডব্লু নয় ম্যাক্সিমাম টাইমে আউট হয়েছেন ক্যাচ দিয়ে। এটা শুধুমাত্র হয়েছে তার স্ট্রেংথ জায়গায় দাড়িয়ে বল হিট করাকে ওভার কনফিডেন্টলি নিয়ে।

আমি ক্ষুদে একজন ক্রিকেটখোর হয়েও যদি এত গুলো সমস্যা আবিষ্কার করতে পারি তাহলে যারা তার বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেন তারা কতটুকু পারবেন? তার এই দূর্বলতা পর্যালোচনা করার পরে আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম তাহলে তো এই প্লেয়ারের ক্যারিয়ারের অর্জনের থেকে ব্যর্থতা বেশি হওয়ার কথা। দ্যান আমি ক্রিকবাজ/ক্রিকইনফো দেখলাম আর এতটুকু নিশ্চিত করলাম আমি যেটা ধারনা করেছি সেটাই সঠিক। সৌম্যর ক্যারিয়ারে আলোর চেয়ে অন্ধকার বেশী। যেটার জন্য পুরোপুরি ভাবে তার ব্যাটিং টেকনিক আর ক্রিকেটীয় ব্রেইন দায়ী।

সৌম্য যদি তরুণ কোনো ক্রিকেটার হতো তাহলে বলতাম এগুলোকে শুধরে সেটা ওভারকাম করতে পারবে, কিন্তু সেটা এখন বলার সুযোগ কই? ২০১৪ থেকে ২০২১ পর্যন্ত প্রায় ৮ বছরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে যেই প্লেয়ার নিজের উইক জোন কাটিয়ে উঠতে পারেনি সে আর কিভাবে পারবে? সৌম্য আর পারবে না। এইটুকু আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারছি তার ব্যাটিং আর তার পরিশ্রম না করার উপর বিশ্বাস রেখেই। আমি জানি আমি ভুল না সৌম্য কামবাক করে আমাকে ভুল প্রমানও করতে পারবে না। এটা সৌম্যকে প্রায় ৮ বছর ধরে চিনি সেই বিশ্বাস থেকে বলতেছি।