Cricketkhor

"ডাল ভাতের সাথে ক্রিকেট খাই,
টাইগারদের জন্য গলা ফাটাই"

শ চী ন – নামটাই যেখানে শিরোনাম!

Mugdha Saha

Mugdha Saha

সেদিন মাঠটি ছিল কানায় কানায় পরিপূর্ণ। এশিয়া কাপে বাংলাদেশ বনাম ভারত ম্যাচের চলছে ৪৪ তম ওভার। বল হাতে প্রস্তুত সাকিব আল হাসান। আম্পায়ারকে অতিক্রম করে নিজের ওভারের চতুর্থ বলটি ছুড়লেন ব্যাটসম্যান শচীন টেন্ডুলকারের দিকে। স্ট্যাম্পের উপরে বল, দু পা এগিয়ে এসে হালকা জোরের উপরে লেগ সাইডে পুশ করে দৌড় দিলেন এবং একটি রান। পপিং ক্রিজ অতিক্রম করে চিরচেনা ভঙ্গিমায় ব্যাটের দিকে একটু তাকিয়ে ব্যাট আর হেলমেট উঁচু করে আকাশের দিকে তাকালেন তিনি। সকলে ছুটে এলেন অভিবাদন জানাতে। সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি পূরণ করলেন শচীন টেন্ডুলকার……

বয়সটা তখন ১১ বছর। বড় বোনের থেকে উপহার পাওয়া ব্যাট নিয়ে বড় ভাই অজিত টেন্ডুলকারের সাথে বের হয়ে যান ক্রিকেটের রাজ্যে বিচরণ করতে। শিবাজি পার্কে শ্রী রমাকান্ত আচরেকার এর অধীনে ক্রিকেট প্র্যাক্টিস শুরু করেন শচীন। প্রতিবার শচীন নেটে যাওয়ার আগে স্টাম্পে একটি কয়েন রাখতেন গুরু রমাকান্ত। শর্ত ছিল এই যে, একবারও আউট না হলেই সেই কয়েন পাবেন শচীন। বলা বাহুল্য, শচীন তার গুরুদেবের ১৩টি কয়েন নিজের করে নিয়ে নিয়েছিলেন।

শচীনের ছোটবেলা

সময়টা ১৯৮৯ সালের ১৫ই নভেম্বর। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে করাচিতে মাত্র ১৬ বছর ২২৩ দিনে অভিষেক ঘটে কোকড়া চুল ওয়ালা দেবাচা মুলগার। হ্যা, শচীন দেবাচা মুলগাই বটে, যা বলেছিলেন তার বাল্যবন্ধু অতুল রানাড৷ যার অর্থ ঈশ্বরের পুত্র৷ দেবাচা মুলগা না হলে কি আর এত মিল পাওয়া যায়! ১৫ই নভেম্বর যখন শচীন ব্যাট হাতে মাঠে নামেন তখন ঘড়ির কাটায় বাজছিল ৩ টা বেজে ৩৪ মিনিট। ২৪ বছরের ব্যবধানে শচীন যখন শেষবার মাঠে নামেন ২০১৩ সালের ১৫ই নভেম্বর, তখনও ঘড়ির কাটায় ৩ টা বেজে ঠিক ৩৪ মিনিট!

১৯৭৩ সালের ২৪ শে এপ্রিল মধ্যবিত্ত ঘরে জন্ম নেয়া শচীনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। মাত্র ১৬ বছর ২২৩ দিন বয়সে অভিষেক ম্যাচেই ওয়াকার ইউনুসের বাউন্সারে নাক ফেটে যায় শচীনের। যখন তার মাঠ থেকে রিটায়ার্ড হার্ট হবার কথা, তখন তা না করে পরের বলেই বাউন্ডারি মেরে দিয়েছেন নাক ফাটানোর জবাব। দ্বিতীয় ইনিংসেই হাফ সেঞ্চুরি করে বিশ্বক্রিকেটে জানান দিয়েছিলেন নিজের আগমণী বার্তার৷ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শচীন ৬৬৪ টি ম্যাচ খেলে করেছেন সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ড, যা ইতিহাসে লেখা থাকবে অনেকদিন।

১৬ বছর বয়সে শচীন

এন্ডি ফ্লাওয়ার শচীনকে নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন, “পৃথিবীতে দু’ধরণের ব্যাটসম্যান আছে। একধরণের শচীন টেন্ডুলকার, আর একধরণ বাকিরা।” কথাটির প্রমাণ শচীন দিয়েছেন সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি পূর্ণ করে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টেস্ট ও ওয়ানডে মিলিয়ে সেঞ্চুরি সংখ্যা ১০০ টি এবং ওয়ানডে ক্রিকেটে করেছেন ইতিহাসের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিও।

টেস্ট ক্রিকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী শেন ওয়ার্ন একবার তার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “শচীন ছিল আমার দুঃস্বপ্ন। আমার বলে সামনে এগিয়ে এসে হাকানো ছয় আমার সামনে ফিরে আসতো বারবার।” বোলারদের দুঃস্বপ্ন এই শচীনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৩ ফরম্যাটে রান সংখ্যা ৩৪,৩৫৭। টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেটে আলাদা আলাদাভাবে শচীনের রান সংখ্যা ১৫,৯২১ ও ১৮,৪২৬। যা হয়তো ছুয়ে দেখা হবেনা অন্য কোন ক্রিকেটারের। কারণ তিনিই তো ক্রিকেট ঈশ্বর।

ওয়ানডে ক্রিকেটে যেন শচীনের রেকর্ডের বড় অংশের ভাগ বসানো আছে। ওয়ানডে ক্রিকেটে ন্যূনতম দশ হাজার রান, ১০০ উইকেট আর ১০০ ক্যাচ নেওয়ার অনন্য রেকর্ড শুধু টেন্ডুলকারেরই আছে। হয়েছেন ওয়ানডে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ৬২ বার ম্যান অব দ্য ম্যাচ ও ১৪ বার হয়েছেন ম্যান অব দ্য সিরিজ। ভারতের হয়ে টানা ১৮৫ টি ওয়ানডে খেলার রেকর্ড শচীন ছাড়া আর কারো ছুয়ে দেখা হয়নি।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান সংগ্রহক শচীন

ক্রিকেটের এই ঈশ্বর যেন সর্বত্র নিজেকে প্রচার করেছেন একজন জেন্টলম্যান হিসেবে। বহুবার আম্পায়ারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে আউট হয়েছেন। হেলমেটে বল লেগে হয়েছেন এলবিডব্লু। কখনো মেজাজ হারাননি তিনি৷ পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে তিনি যেন ছিলেন সকল বিতর্কের উর্ধ্বে। ১৯৯৯ সালে আজহারউদ্দীন ক্যালেঙ্কারিতে ভারত যখন ফিক্সিংয়ের কালো থাবায় আক্রান্ত তখন ভারত দলের দায়িত্ব তুলে দেয়া হয়েছিল ১৯৯৬ ও ২০০৩ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক এই ক্রিকেট ঈশ্বরের হাতে৷ তরুণ ক্রিকেটারদের কাছে তিনি ছিলেন বটবৃক্ষের মতো। তাঁর দেখানো পথে হেটে সফল হয়েছেন অনেক তরুণ ক্রিকেটার। দীনেশ কার্তিক একবার বলেছিলেন, “তিনি যে আমাকে চেনেন, আমার নাম জানেন, এই তো আমার সাত জনমের ভাগ্য।”

দেশের জন্য আত্মপ্রত্যয়ী শচীন টেন্ডুলকারকে রুখতে পারেননি তার বাবার মৃত্যুও। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের সময় বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে ভারতে ফিরে এসেছিলেন। দলের প্রয়োজনে শোককে পাশ কাটিয়ে তিনি ফিরে যান ইংল্যান্ডে। ফিরেই তিনি খেলেছিলেন কেনিয়ার বিরুদ্ধে ১০১ বলে ১৪০ রানের অপরাজিত এক দুর্দান্ত ইনিংস। এটিই ছিল শুরু। তারপর থেকে যখনই তিনি শতকের দেখা পেয়েছেন, হেলমেট খুলে আকাশে খুঁজে ফিরেছেন তাঁর প্রিয় বাবাকে। যার ইতি হয়েছিল এশিয়া কাপে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শততম সেঞ্চুরির মধ্য দিয়ে।

বল হাতে ক্রিকেট ঈশ্বর

টেস্ট ক্রিকেটে শচীন টেন্ডুলকার গুণে গুণে খেলেছেন ২০০ টি ম্যাচ৷ ৫৩.৭৯ গড়ে রান করেছেন ১৫৯২১। সেঞ্চুরি ৫১টি, হাফ সেঞ্চুরি ৬৮টি। একদিনের ক্রিকেটে খেলা ম্যাচের সংখ্যা ৪৬৩টি। ৪৪.৮৩ গড়ে রানের সংখ্যা ১৮৪২৬। ৯৬টি হাফ সেঞ্চুরির পাশে পূর্ণিমার আকাশের তারার মতো ঝিকঝিক করছে ৪৯টি সেঞ্চুরি। টি-২০ ক্রিকেটে ভারতের জার্সি গায়ে ম্যাচ খেলেছেন মাত্র ১টি। রান করেছেন ১০। বল হাতেও ক্রিকেট ঈশ্বর টেস্টে নিয়েছেন ৪৬টি উইকেট, ওয়ানডেতে ১৫৪টি৷ ২ বার ৫ উইকেট নেবার পাশাপাশি সেরা বোলিং ফিগার ৩২/৫।

সিডনী ক্রিকেট মাঠের ব্যানারে একবার ভেসে উঠেছিল, “যার যা অপরাধ করার, সব শচীন ক্রিজে থাকার সময় করে নাও। কেউ তোমায় দেখতে আসবে না। কারণ, স্বয়ং ঈশ্বরও তো তখন খেলা দেখতে ব্যস্ত।” কথাগুলো যেন ফুটে ওঠে শচীনের রেকর্ডে। শচীন তার সময়ে যে নয় দলের বিপক্ষে টেস্ট খেলেছেন, প্রত্যেক দলের বিপক্ষে তাঁর গড় ন্যূনতম ৪০। টেস্টে এশিয়ার ব্যাটসম্যানদের মধ্যে প্রতিপক্ষের মাঠে সবচেয়ে বেশি ব্যাটিং গড়ও তাঁর (৫৪.৭৪)।

বিশ্বকাপ হাতে শচীন

ছোটবেলা থেকেই শচীনের স্বপ্ন ছিল বিশ্বকাপ জয়ের৷ বিশ্বকাপে ৪৫টি ম্যাচ খেলার পাশাপাশি ৫টি ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন দলকে। ৫৬.৯৫ গড়ে রান করেছেন ২২৭৮। ৬টি শতকের সাথে অর্ধশতক ১৫টি। ২০০৩ বিশ্বকাপে ম্যান অব দ্য টুর্ণামেন্ট হলেও খুব কাছ থেকে ফিরে আসতে হয়েছে। নিজের শেষ বিশ্বকাপে ঘরের মাটিতে পূরণ করেছেন নিজের স্বপ্ন। ২০১১ বিশ্বকাপ জয় যেন ক্রিকেটকে একটি অপূর্ণতা থেকে মুক্তি দিয়েছিল। ক্রিকেট ঈশ্বরের রাজমুকুটে আরো একটি পালক যুক্ত করেছিল।

শচীন টেন্ডুলকার এর বিদায়ী ম্যাচে দর্শক হিসেবে আসা ব্রায়ান লারা তার সম্পর্কে বলেছেন, “হি হ্যাজ স্ক্রিপ্টেড দ্য গ্রেটেস্ট এভার ক্যারিয়ার।” সত্যিই হয়তো শচীনের ক্যারিয়ারটি ছিল স্ক্রিপ্টের মতোই তৈরি। এজন্যই হয়তো উইজডেন বর্ষসেরা ক্রিকেটার(১৯৯৭), ভারতের পদ্মশ্রী ও পদ্মবিভূষণ পুরষ্কার সহ বহু পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন৷ করেছেন ১৯৯৭, ১৯৯৯, ২০০১, ২০০২, ২০০৮, ২০১০ ক্যালেন্ডার ইয়ারে সর্বোচ্চ রান৷ শুধু তাই নয়, এক ক্যালেন্ডার ইয়ারে ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি করার রেকর্ড তাঁর। ১৯৯৮ সালেই নয়টা ওয়ানডে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন তিনি।

শেষবার ব্যাটিংয়ে নামার আগে দেবাচা মুলগা

শচীন খেলা ছেড়েছেন প্রায় ৭ বছর আগে। কিন্তু মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়েতে এখনো ভারতের ম্যাচে ‘শচীন, শচীন, শচীন, শচীন’ গর্জন হয়, যেমনটা হয়েছিলো তার পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে। ১২০ কোটি মানুষের প্রত্যাশা ভার তুলে নিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়েছেন ২৪ টি বছর৷ এই ২৪ বছরে ছাড়িয়ে গেছেন অনেক রথীমহারথীদের, ছাপিয়ে গেছেন নিজেকে। মানুষ হিসেবে যিনি ছিলেন জেন্টেলম্যানস গেমের সবচাইতে বড় জেন্টেলম্যানদের একজন। দিনশেষে অমর সব কীর্তি আর ব্যাটিং সৌন্দর্যে মোহিত করার জন্য শচীনকে ধন্যবাদ।