Cricketkhor

"ডাল ভাতের সাথে ক্রিকেট খাই,
টাইগারদের জন্য গলা ফাটাই"

বাবার দেখানো পথে জিসান আলমের স্বপ্নযাত্রা !

Sayem

Sayem

২০২২ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ফটোসেশনে জিসান আলম

জিসান আলম; বাংলাদেশের সবশেষ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কনিষ্ঠ সদস্য আলো ছড়াচ্ছেন ঘরোয়া ক্রিকেটে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে প্রথম বিভাগে টুর্নামেন্টসেরার দৌড়ে থাকা জিসানের রক্তে যেন ক্রিকেট!

নারায়ণগঞ্জে জন্ম ও বেড়ে ওঠা জিসানের বাবা জাহাঙ্গীর আলম ও চাচা জুয়েল হোসেন মনা দুজনই বাংলাদেশের জার্সিতে মাঠ মাতিয়েছিলেন। আরেক চাচা সোহেল হোসেন পাপ্পু দীর্ঘদিন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছেন।

জাহাঙ্গীর আলম ১৯৮৯ সালে ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিপক্ষে করেছিলেন ১৩২ রান। ১৯৯৪ আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান জাহাঙ্গীর আরব আমিরাতের বিপক্ষে ১১৭ রান করেছিলেন। জাভেদ ওমরের সাথে ২১৯ রানের ওপেনিং জুটিও আছে তার। টানা তিন সিজনে ঢাকা লীগে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক জাহাঙ্গীরকে জায়গা হারাতে হয় পাইলটের কাছে। তার সন্তান জিসান যে ক্রিকেটার হবে এটা যেন আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল!
ছোটবেলা বাবা-চাচাদের ব্যাট-বল-গ্লাভস দেখে বড় হওয়া জিসানকে ২০১১ সালে স্থানীয় নারায়ণগঞ্জ ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি করানো হয়। সেখান থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ক্রিকেট শেখা জিসানের। বাংলাদেশ গেমসের ফাইনালে ঝড়ো ইনিংস খেলে আলোচনায় আসা জিসান বিশ্বকাপে স্ট্যান্ডবাই থাকলেও আক্ষেপ ছিল না তার।

প্রিয় ব্যাটার রোহিত শর্মার মতো ডানহাতে ব্যাট করেন জিসান, বোলিংয়ে অফস্পিনটা বেশ ভালোই করেন তিনি। বাবার মতো ওপেনিংয়ে খেলা জিসান দলের প্রয়োজনে বোলিংয়ে দারুণ স্পেল করতে পারদর্শী। সবসময় আগ্রাসী মনোভাবে ব্যাট করা জিসান সাকিব আল হাসানের বড় ভক্ত। প্রায় ৬ ফুট উচ্চতার এই ক্রিকেটারের প্রিয় শট কাভার ড্রাইভ।

এখন পর্যন্ত তার ক্যারিয়ার সম্পর্কে বিস্তারিতঃ
২০২০ এর শেষদিকে হোসাইন গ্রুপ আয়োজিত কর্পোরেট টুর্নামেন্ট বঙ্গবন্ধু প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লীগ এ নারায়ণগঞ্জ ক্রিকেট একাডেমির হয়ে খেলার সুযোগ পান জিসান। এক ফিফটিতে ৬ ইনিংসে ১৪৮ রান করেছিলেন সেখানে।

দুই মাস পর ‘২১ এর ফেব্রুয়ারিতে বিসিবি অনূর্ধ্ব-১৭ চ্যালেঞ্জ সিরিজ এ টেস্ট ফরম্যাটে ব্রহ্মপুত্র দলের হয়ে ৫ ইনিংসে দুই ফিফটিতে ১৫৯ রান, বল হাতে নেন ৮টি উইকেট। ওয়ানডে ফরম্যাটের দুই ম্যাচে ১৯ রান ও ৫ উইকেট নেন। ৫ ম্যাচে ৪টি ডিসমিসালের অংশীদারও ছিলেন তিনি। ব্যাটে-বলে সেরা পারফর্ম করে টুর্নামেন্ট সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। এই টুর্নামেন্টে নিজের বোলিং সত্ত্বাকে পুরোপুরিভাবে মেলে ধরতে সক্ষম হন জিসান।

বাংলাদেশ গেমসের ফাইনালে ১৬৯ রান করে ম্যাচসেরা; যে ইনিংস দিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন জিশান

মার্চ-এপ্রিলে বাংলাদেশ গেমস ক্রিকেটের পুরুষ ইভেন্টে জাহাঙ্গীরাবাদ সেন্ট্রাল জোনের হয়ে ৪ ইনিংসে ৬৩ এভারেজে ২৫২ রান। যার মধ্যে আছে ফাইনালে বরেন্দ্র নর্থ জোনের বিপক্ষে ম্যাচজয়ী ১৬৯ রানের ইনিংস, ১১৯ বলের ইনিংসটি ছিল ২০ চার ও ৮ ছক্কায় সাজানো! ৪ ডিসমিসালও করেছিল সে।

এরপর দীর্ঘদিন প্রতিযোগিতা মূলক ক্রিকেটে জিসানকে দেখা যায়নি। এরই মাঝে শুরু হয় ২০২২ অনূর্ধ্ব-১৯ ব্যাচের কার্যক্রম। প্রথম কয়েকটি সিরিজে দলে ঠাঁই না পেলেও বিশ্বকাপের আগে ভারত সিরিজে তাকে দেখা যায়, যদিও কোনো ম্যাচে মাঠে নামেননি তিনি। তবে বাংলাদেশ গেমস, অনূর্ধ্ব-১৭ টুর্নামেন্টের পারফরম্যান্স বিবেচনায় দলের সবচেয়ে জুনিয়র সদস্য হিসেবে বিশ্বকাপের ১৭ জনের মধ্যে জায়গা হয় তার। মূল স্কোয়াডের ১৫ জনের বাইরে ট্রাভেলিং রিজার্ভ হিসেবে দলের সঙ্গে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে ছিলেন জিসান।

অ-১৯ এশিয়া কাপে দলে সঙ্গে শারজাহ-দুবাইতে ছিলেন জিসান

বিশ্বকাপ থেকে ফিরেই জিসান নতুন রূপে হাজির হন প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লীগে! ওল্ড ডিওএইচএস এর হয়ে পুরো সিজন খেলেন তিনি।
টি-২০ তে প্রথম ম্যাচেই ঝড়ো ফিফটির সুবাদে ম্যাচসেরা হন তিনি। তবে ছন্দ ধরে রাখতে পারেননি বাকী ম্যাচগুলোতে। ৪ ম্যাচে ৮৭ রান ও ২ উইকেট নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাকে।

এরপর ঢাকা প্রথম বিভাগ ওয়ানডে লীগে অভিষেকে দারুণ ঝলক দেখান তিনি। ম্যাচসেরা পারফর্মার জিসান খেলেন ১০ ছক্কা, ১২ চারে ১০১ বলে ঝড়ো ১৪৭ রানের ইনিংস, এরপর বল হাতে ২ উইকেট; ফার্স্ট ডিভিশনে অভিষেকটা এরচেয়ে স্মরণীয় হতে পারতো না! পরের ম্যাচে ৪১ রানের সাথে ৩ উইকেট, আবারও ম্যাচসেরার পুরষ্কার বাগিয়ে নেন জিসান। দুই ম্যাচ পর আবারও ম্যাচসেরা জিসান আলম, এবারের পারফরম্যান্স ১৬৭ স্ট্রাইকরেটে ৫৭ রান ও ২ উইকেট। এক ম্যাচ পর আবারও ম্যাচসেরা হওয়া জিসানের পারফরম্যান্স ৮২ রান ও ১ উইকেট!
প্রতি ম্যাচে ওপেনিংয়ে নেমে ঝড়ো শুরু করতেন তিনি। টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্ব শেষে নামের পাশে প্রায় ১৩০ স্ট্রাইকরেট ও ৫৩ এভারেজে চার ফিফটি, এক সেঞ্চুরিতে ৪৭৮ রান এবং বোলিংয়ে ৪ ইকোনমিতে ১০ উইকেট! গ্রুপ পর্বে ওল্ড ডিওএইচএস এর খেলা ৯ ম্যাচের মধ্যে ৪ ম্যাচে ম্যাচসেরা হয়ে টুর্নামেন্ট সেরা হওয়ার দৌড়ে সবার আগে আছেন জিসান।

প্রথম বিভাগে অভিষেকটা হয়েছিল স্বপ্নের মতো
উল্লেখ্য, প্রথম বিভাগে তার সাথে একই দলে খেলেছেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সতীর্থ খালিদ হাসান; এছাড়া উত্তরা ক্রিকেট ক্লাবে খেলেছেন একই ব্যাচের মাহফিজুল ইসলাম রবিন, ইফতেখার হোসাইন ইফতি, আইচ মোল্লা, গোলাম কিবরিয়া; সকলেই দুর্দান্ত পারফর্ম করেছেন টুর্নামেন্ট জুড়ে।

প্রথম বিভাগে গ্রুপ পর্বের খেলা শেষ হওয়ার দুইদিন পরই সিলেটে গিয়ে নেমে পড়েন অনূর্ধ্ব-১৮ টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচে ঢাকা দক্ষিণের হয়ে। প্রথম ইনিংসে দলের বিপর্যয়ের মাঝে তার সংগ্রহ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৩ রান।

জিসানের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো ধারাবাহিকতা, ডিওএইচএস এর হয়ে প্রতি ম্যাচেই রান সংগ্রহ করেছেন তিনি। এছাড়া পাওয়ার হিটিংয়ের কথা না বললেই নয়। উইকেটের চারপাশে মোটামুটি সমানভাবে হিট করতে পারা জিসান লেগসাইডে বড় বড় ছক্কা হাঁকাতে দক্ষ। এছাড়া স্ট্রাইক রোটেশন ও লক্ষনীয়। বোলিংয়ে তার বিশেষত্ব হচ্ছে ভালো টার্ন আদায় করতে পারা।

ফিল্ডিংয়েও বেশ পটু জিসান প্রস্তুতিতে নিজের সেরাটাই দিয়ে থাকেন

২০০৪ সালে জন্ম নেয়া জিসানের বয়সটা মাত্র আঠারো। এখনই নিজের প্রতিভা মেলে ধরছেন জাতীয় পর্যায়ে। আরো একবার অনূর্ধ্ব-১৯ জার্সি গায়ে ছাপানোর সম্ভাবনা অনেক তার। এখনই তার খেলার ধরণ দেখলে দেশসেরা ক্রিকেটার সাকিবের একটা ছায়া পাওয়া যায়, জাতীয় দলে সাকিব যেমন বল-ব্যাটে দলের সেরা পারফর্মার হতে দক্ষ, জিসানও তেমনই। It’s Too Early To Say, কিন্তু কে জানে জিসান হতে পারেন বাংলার ক্রিকেটের আগামীর সাকিব।

এখনো বয়সভিত্তিক ক্রিকেট খেলা জিসান অনুপ্রেরণা, মোটিভেশান পান তার বাবা-চাচাদের কাছ থেকে। পরিবার থেকে সবসময়ই সর্বোচ্চ সহযোগিতা পাচ্ছেন তিনি।

এবারের অনূর্ধ্ব-১৯ ব্যাচের সাথে দীর্ঘদিন থেকে কোনো ম্যাচ খেলার সুযোগ না হলেও যখনই সুযোগ আসবে নিজের সর্বোচ্চটা দিতে প্রস্তুত আছেন তিনি। স্বপ্ন দেখেন, একদিন বাবার মতো জাতীয় দলে খেলবেন। বাবার মতো ওপেনিংয়ে নেমে প্রতিপক্ষ বোলারদের শাসাবেন প্রিয় ব্যাটখানা দিয়ে।