Cricketkhor

"ডাল ভাতের সাথে ক্রিকেট খাই,
টাইগারদের জন্য গলা ফাটাই"

ঐতিহাসিক ৬৮ রান, যা বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভিত্তি

Nayan

Nayan

আজকের বাংলাদেশের ক্রিকেটে তামিম, সাকিব, মাশরাফিরা ক্রিকেট বিশ্বের বড়তারকাদের একজন। কিন্তু মাশরাফিদের জন্য এই প্লাটফর্ম তৈরি করেছিল ৯০ দশকের সংগ্রামী খেলোয়াড়রাই। বর্তমান বাংলাদেশ ক্রিকেটকে, আজকের এই পর্যায়ে নিয়ে আসার পিছনে অবদান ছিল ৮০ এবং ৯০ দশকের খেলোয়াড়দের। নিজেদের স্বল্প ক্রিকেট টেকনিক ও ক্ষমতা নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম ও মেধা দিয়ে ক্রিকেট খেলেছিলেন তাদের মধ্য একজন চট্টগ্রামের খান পরিবারের আকরাম খান।

সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশ ক্রিকেটে ১২৪ টেস্ট ও ৩৮৮ ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছে, অর্জনের খাতায়ও যোগ হয়েছে অনেক গুলো সফলতা আর ৮০/৯০ দশক ছিল এই বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভিত্তি বা সফলতার ভিত্তি। আর এই ভিত্তি গড়ে তোলার নায়কদের মধ্য মহানায়ক আকরাম খান।
১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটের মূল ভিত্তি ধরা হয়। এই ট্রফি জয়লাভ করতে না পারলে আমরা অনেক পিছনে থাকতাম আধুনিক ক্রিকেটে। হয়তবা ৪ বছর পিছনে থাকতে হত আমাদের, অথবা কেনিয়ার মত আমাদের হারিয়ে খুঁজা লাগত আবার।

১৯৯০ সালে বিশ্বকাপ বাঁচাই পর্বে জিম্বাবুয়ের সাথে পরাজিত হতে হয় বাংলাদেশকে, সে ম্যাচে জিম্বাবুয়ের টপঅর্ডারের ৪ জন ব্যাটসম্যানকে আউট করে ৩৭ রানের মাথায়। তারপরও জিম্বাবুয়ে করে ২৩৭ রান আর বাংলাদেশ অলআউট হয় ১৪৭ রানে। বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন শেষ তখন।
আবার ৪ বছর অপেক্ষার পর, ১৯৯৪ সালে কেনিয়ার সাথে জয়ের কাছে গিয়েও হারতে হয় ১৩ রানে। আবারও বিশ্বকাপের স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। কেনিয়ার ২৯৪ রানে জবাবে তবু ভালই খেলেছিল সেদিন বাংলাদেশ।
এবার আবারও ১৯৯৭ সালে আই সি সি ট্রফি। এখানে চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে বিশ্বকাপের দরজা খুলবে। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে, টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে হলে জিততে হবে , এমন ম্যাচে মুখোমুখি হয় নেদারল্যান্ডের। বলে রাখা ভাল, সেই সময়ের নেদারল্যান্ড তখনকার বাংলাদেশের চেয়ে কম শক্তিশালী ছিল না। টসে জিতে বাংলাদেশ ফিল্ডিং করে। রফিক ও আকরাম খানের বোলিংয়ে নেদারল্যান্ডকে ১৭১ রানে আটকে রাখে বাংলাদেশ। আকরাম খান বোলিংয়ে ২১ রানে নেন ২ উইকেট।

১৭২ রানে জয়ের লক্ষ্যে খেলতে নেমে ব্যাটসম্যানরা আবারও আশাহত করেন। ৭ রানের মাথায় ১ম উইকেট , তারপর ১৫ রানে ৪ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। হয়ত ওখানেই শেষ বাংলাদেশের ১৯৯৯বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন। কারণ এই ম্যাচ হারলে বিদায় টুর্নামেন্ট থেকে। স্বপ্ন ভঙ্গের আশঙ্কায় এই দেশের মানুষ , টিভিতে খেলা দেখা না গেলেও রেডিও ছিল মানুষের এক মাত্র সম্বল। ক্রিকেট পাগল মানুষের দুই কান ছিল রেডিওতে।

নেদারল্যান্ডের লেফেভ্রের সুইং ও অসিমের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে কি বাংলাদেশ? একের পর এক আতহার আলী(৪), নাঈমুর রহমান(০), সানোয়ার হোসেন(০) ,আমিনুল ইসলাম(৪) ফিরে গেলেন সাজঘরে। ক্রিজে আছেন চট্টগ্রামের দুইজন আকরাম খান ও মিনহাজুল নান্নু। ভয়াবহ প্রতিকূল অবস্থায় বীরত্ব আর নার্ভের চরমতম পরীক্ষা দিতে হবে জয় লাভ করতে হলে। এই নার্ভের পরীক্ষায় ২০২০ সালেও পরাজিত হয়/হচ্ছে বাংলাদেশ। একমাত্র অনূর্ধ্ব ১৯ দল ২০ সালে এসে নার্ভের পরীক্ষায় জয়ী হয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়।

সেদিন প্রাথমিক পরীক্ষায় দুইজন মিলে ৫৬ রানের জুটি গড়েন ১৮ ওভারে। এর মাঝে শুরু হল বৃষ্টি। হয়ত আবহাওয়াও আমাদের প্রতিপক্ষ হতে চায়। এবার বৃষ্টি আইনে টার্গেট দাঁড়ায় ৩৩ ওভারে ১৪১ রান। অর্থাৎ ৮৫ বলে ৮৫ রান। এদিক ওদিক হলে রানরেট ধরাছোঁয়ার বাহিরে চলে যাবে।

বৃষ্টির পর আউট হয়ে যায় নান্নু, সেই সাথে এনামুল হক মনিও। আবারও চিন্তার ভাঁজ ক্রিকেটপ্রেমী মানুষের চোখে মুখে। আকরাম খান ব্যতীত আর কোন স্বীকৃত ব্যাটসম্যানও নাই। বোলার সাইফুল ইসলামকে সাথে নিয়ে শুরু করলেন লড়াই আকরাম খান। এক-দুই রান নিয়ে দলের রান বাড়াতে শুরু করলেন প্রতি ওভারের ৬ রানের উপর রানরেট, তবু চার-ছক্কা দিকে নজর না দিয়ে স্ট্রাইক রোটেট করে খেলে জয়ের বন্দরে নিয়ে যায় আকরাম খান। আর দলের জন্য মহামূল্যবান ১৮ রান করেন সাইফুল। ১৩৬ রানের মাথায় আউট হয়ে গেলে খালেদ মাসুদ পাইলটকে সাথে নিয়ে বাকী কাজটা সহজে করেন আকরাম খান। ৯২ বলে মাত্র ৩ টি চারের সাহায্যে অপরাজিত ৬৮ রান।

একাই আরাধ্য কাজ করে দিলেন আকরাম। ঠাণ্ডা মাথায় দৃঢ়তা ও দক্ষতা দেখিয়েছে সেদিন। দুর্যোগময় মুহূর্তে কিভাবে খেলার হাল ধরতে হয় তাও দেখেছে সবাই। পরে সেমিফাইনালে স্কটল্যান্ড ও ফাইনালে কেনিয়াকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। ফাইনাল ম্যাচেও ২৭ বলে ২২ রান করে জয়ে অবদান রাখেন আকরাম।

১৯৮৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেক হয় আকরাম খানের। অভিষেক ম্যাচে অপরাজিত ২১ রান করেন। ক্যারিয়ারের ১ম ম্যাচে অর্থাৎ প্রায় ৯ বছর পর প্রথম হাফ সেঞ্চুরি করেন পাকিস্তানের বিপক্ষে। ওয়ানডে ইতিহাসের বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচ জয়ে ছিল আকরাম খানের দায়িত্বশীল ৩৯ রান। ১৯৯৯ সালের মার্চ মাসে কেনিয়ার বিপক্ষে ক্যারিয়ার সেরা ৬৫ রান করেন।

১৯৯৯ সালে বিশ্বকাপে তখনকার সেরা দল পাকিস্তানকে প্রথম বারের মত হারায় বাংলাদেশ। ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনুস, শোয়েব আক্তার,সাকলাইন মুস্তাকের সামনে ৪২ রানের অসাধারণ একটি ইনিংস খেলে দলীয় সংগ্রহ ২২৩ রানে নিয়ে যায়। সেম্যাচে দলের পক্ষে সর্বোচ্চ রানও ছিল আকরাম খানের।

আর এই জয়, আমাদের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করে। ২০০০ সালে এশিয়া কাপে ৫২ বলে ৬৪ রান করেন ভারতের বিপক্ষে। সে সময়ে আমাদের কেউ ১০০ স্ট্রাইকরেটে রান করার চিন্তাই করত না, এক মাত্র রফিক ব্যতীত।

২০০৩ সালে দুঃস্বপ্নের মত একটি বিশ্বকাপ ছিল। বিশ্বকাপের মূল স্কোয়াডে সুযোগ হয় নাই শুরুতে কিন্তু মাঝপথে গিয়ে কেনিয়ার বিপক্ষে ৪৪ রান করেন। সেদিন অন্য ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় হারতে হয় বাংলাদেশকে। ২০০৩ সালে দেশের মাটিতে সর্বশেষ ওয়ানডে ম্যাচ খেলেন দঃ আফ্রিকার বিপক্ষে। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের অভিষেক ম্যাচের সদস্য ছিলেন। অভিষেক ম্যাচে করেন ৩৭ রান। ৮ টি টেস্টে ২৫৯ রান করেন। গড় ১৬। কোন অর্ধশত রান করতে পারেন নাই।
ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৪৪ ম্যাচে ৯৭৬ রান গড় ২৩। অর্ধশত ৫ টি। সেঞ্চুরি নাই। এমন একটি পরিসংখ্যান কোন খেলোয়াড়কে মহানায়ক বানাবে না। অথবা কিংবদন্তীও বলবে না। কিন্তু পরিসংখ্যান সব সময় কিংবদন্তী বানায় না। নব্বইয়ের দশকই ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের উজ্জ্বল সংগ্রামের দিন। আর এই সংগ্রামের মহানায়ক আকরাম খান। আইসিসি ট্রফিতে নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে আকরাম খানের ৬৮ রানের ওই ইনিংসেই দাঁড়িয়ে আজকের বাংলাদেশের ক্রিকেট।

১৯৯৪ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ জাতীয় দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁরই নেতৃত্বে ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত আইসিসি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলাদেশ দল, সেই সাথে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। ১৯৯৮ সালে কেনিয়ার বিপক্ষে প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে জয় পায় বাংলাদেশ। প্রথম জয়ের অধিনায়ক ছিলেন আকরাম খান।

১৯৬৮ সালে চট্টগ্রামে আজকের এই দিনে জন্ম গ্রহণ করেন আকরাম খান। আমাদের বর্তমান সময়ের সুদিন এনে দেয়ার জন্যে, ক্রিকেটে সর্বোচ্চ অবদান রাখা আকরাম খানকে ক্রিকেটখোরের পক্ষ হতে হৃদয়ের গভীর থেকে শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা জানাই।

শুভ জন্মদিন বীর। বেঁচে থাকুন, ক্রিকেটেই থাকুন। বাংলাদেশের ক্রিকেট যতদিন থাকবে আপনাকে আজীবন স্মরণ করবে এই দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা।