২৫শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ব্যাটসম্যান মুমিনুল, ক্যাপ্টেন মুমিনুল

প্রতিবেদক
Rabiul Islam Shakib
মঙ্গলবার, ৯ ফেব্রুয়ারি , ২০২১ ৪:২৪

মুমিনুল হক সৌরভ, ২০১২ এর ৩০ নভেম্বর পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট দিয়ে জাতীয় দলে অভিষেক। দিন দশেক পর টি-টুয়েন্টি ক্যাপও পরেন। ৩ মাস পর বাংলাদেশের ইতিহাস গড়া ম্যাচে অভিষিক্ত হলেন টেস্টে। ৮ মার্চ ২০১৩, মোহাম্মদ আশরাফুলের ১৯০, মুশফিকের ২০০, নাসিরের ১০০ আর লংকার মাটিতে তাদের বিপক্ষে ড্র করার ম্যাচে অভিষেক মুমিনুল হকের। এক ইনিংস ব্যাট করেছেন; সেখানেই পঞ্চাশোর্ধ্ব রান। শুরুটা সেখান থেকেই। সময়ের পরিক্রমায় সে এখন আমাদের টেস্ট দলের সেরা ব্যাটসম্যান, সে আমাদের জাতীয় টেস্ট দলের ক্যাপ্টেন।

অভিষেকটা রঙিন পোশাকে আগে হলেও মুমিনুল থিতু হন টেস্ট ক্রিকেটে। একের পর এক সাফল্য, বেশিরভাগ আবার নিজ দেশে। জহুর আহমেদ চৌধুরীতে গেলে তো তিনি ক্রিকেটীয় দানবই বনে যান একরকম। মাত্র ৪১ ম্যাচেই ১০ টি শতক আর ১৩ টি অর্ধশতক। মাত্র বললাম বলে হেসে উঠলেন? আমাদের দেশের জন্য এটা যে অনেক বেশি কিছু। ১০ টেস্ট সেঞ্চুরিতো আমাদের অন্য কারও এখনো নেই। ৬১ ম্যাচ খেলে ২য় সর্বোচ্চ তামিমের ৯ টি। ৪১.৬৮ গড় নিয়ে এখানেও সবার উপরে মুমিনুলই।

জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে শতকের পর মুমিনুল

ব্যাটসম্যান মুমিনুলের ওভারাল পরিসংখ্যান নিয়ে এগোলে মুমিনুলই যে আমাদের এখন পর্যন্ত সেরা টেস্ট ব্যাটসম্যান তা নিশ্চিতভাবেই সবাই মেনে নেবেন। তবে পরিসংখ্যানটাকে দেশ-বিদেশে ভাগ করলে দুই পাল্লার মধ্যের তফাতটা সবার নজরেই পরবে। দেশ-বিদেশে আলাদা করলে দেশে তার গড়টা বাড়বে; বেড়ে হবে ৫৮.০৭। আর দেশের বাইরে? সেটা ২২.৩০। দেশের বাইরে কোনো শতক নেই মিমির, তবে অর্ধশতক আছে, সংখ্যাটা ৭। হোম-এওয়ের পরিসংখ্যানটাকে একটু আলাদা করে দেখা যাক টেবিলে:

ফ্যাক্টহোমএওয়ে
ম্যাচ২৪১৭
ইনিংস৪৩৩৩
রান২২৬৫৭৩৬
গড়৫৮.০৭২২.৩০
স্ট্রাইক রেট৫৯.৩০৪৭.০৫
১০০/৫০১০/৭০/৬
সর্বোচ্চ১৮১৭৭
ডাক
০-২০ রানের মধ্যে আউট১৩ বার১৯ বার

স্পষ্টতই দেশের মাটিতে যে দেশসেরা ব্যাটসম্যান দেশের বাইরে সেই হ-য-ব-র-ল। এর মধ্যে আলাদা ভাবে সাগরিকার জহুর আহমেদকে নিয়ে তুলনা করতে গেলে চোখ উঠবে কপালে। দেশের মাটিতে করা ১০ সেঞ্চুরির ৭ টাই সেখানে। এখানে মুমিনুলের অর্ধশতক মাত্র ১ টি, আফগানিস্তানের বিপক্ষে। জহুর আহমেদে মিমির গড় ৭৪.৮১। সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটিও এখানেই খেলা। এখানে খেলা ১৯ ইনিংসে শূন্য রানে আউট হয়েছেন মাত্র ১ বার। স্ট্রাইক রেটটাও এখানে ৬২.৬৩। হোক না হোম ট্র্যাক বুলি, মিমি তাতেও আমাদের টেস্টে সেরাই। তাইতো সাকিবের অনুপস্থিতিতে দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্বও দেয়া হলো মুমিনুলকেই।

অধিনাকত্বের শুরুটা ২০১৯ এর শেষে ভারত সফর দিয়ে। দেশের বাইরে তার পারফরমেন্স এমনিতেও বাজে হয়, তবে সেবার সবথেকে বাজে ছিলো। এক টেস্টে ২ ইনিংসেই শূন্য রানের রেকর্ডও সেবার গড়েছিলো মুমিনুল। ৪ ইনিংসের রানগুলো ৩৭, ৭, ০, ০। রাওয়ানপিন্ডিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩০ আর ৪১। ম্যাচ তো অবশ্যই সব হেরেছে। বাংলাদেশ টেস্ট জিতবে ভারত-পাকিস্তানের বিপক্ষে তাদের মাটিতে; এটাও সম্ভব নাকি আবার। তবে সবগুলোতে ইনিংস ব্যবধানে না হারলেও পারতো। এখানে দোষটা ক্যাপ্টেনের ক্যাপ্টেন্সিতে কতটুকু সেটা আলোচনার ব্যাপার। পুরোনোকে ফেলে রেখে তার ক্যাপ্টেন্সি করা শেষ ম্যাচ নিয়েই না হয় দু-চারটে কথা বলা যাক।

বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট সিরিজ (ফেব্রুয়ারি ২০২১) এর প্রথম ম্যাচের একটি ছবি

ম্যাচের ফলাফল তো সবারই জানা! পুরো ৪ দিন ডমিনেট করে শেষদিনের প্রথম দুই সেশনে হাপিত্যেশ তোলা অবস্থা! আগের দিন ৩ উইকেট ফেলে দেয়া দলটার পরের উইকেটটা ফেলতে যে এরকম ভাবে ব্যর্থ হবে তাইজুল, মিরাজ, নাইমরা এটা কেউই ভাবেনি। উইকেট ফেলতে না পারার দোষতো বোলারদের, তাহলে অধিনায়কের দোষ কোথায়? ম্যাচ শেষে মুমিনুলও তেমনটা বলেছেন, “বোলাররা ঠিক জায়গায় বল করতে পারে নি।” সব দোষ বোলারদেরই, সাথে সাকিবেরও বা তার ইনজুরির।

ম্যাচ শেষে যেই কথাটা মুমিনুল বললেন, ম্যাচ চলাকালীন সেই কথাটা কি মুমিনুল তার বোলারদের বলেছেন? তামিম-মুশফিকদের সাথে নিয়ে বোলারদের একত্র করে কতবার আলোচনা করেছেন অধিনায়ক? ব্যাটসম্যানদের জন্য আলাদা করে কোনো ছঁক এঁকেছিলেন? উত্তর কি এসব প্রশ্নের?

প্রশ্নে পরিবর্তন আনা যাক। পার্ট টাইম বোলার কেনো ব্যবহার করেনি? খুব অদ্ভূত। না প্রশ্নটি না, তবে প্রশ্নটি কেনো উঠলো সেটা। দলে বোলার ছিলো ৫ জন, সাকিব ইনজুরিতে আর মুস্তাফিজের জন্য এখানে কিছু নেই, থাকতে পারতো যদি মুস্তাফিজকে যখন বোলিং এর দায়িত্ব দিচ্ছিলেন ক্যাপ্টেন তখন দলের ক্যাচিং পজিশনে ফিল্ডার রাখতেন। ক্যাচ উঠে বাউন্ডারি হতে হতো না তখন, আউট হতো ব্যাটসম্যান। বাকি রইলো তিন বোলার। তাইজুল, মিরাজ, নাইম।

মিরাজ নেমেছিলেন দুটো রেকর্ডের স্বপ্ন নিয়ে। চতুর্থ প্লেয়ার হিসেবে একই টেস্টে শতক আর ১০ উইকেট, সাথে দেশের পক্ষে ১০০ উইকেটের হাতছানি ছিলো তার সামনে। পুরোটা দিন বল করে গেলেন এই ৩ জনই। মাঝে এক ওভারের জন্যও অন্য কেউ না, দলের অন্য দলপতিরা কিন্তু মিমিকে বল করিয়েছেন। মাত্র ৬০১ টা বল ছুড়ে ৪ টা উইকেটও নিয়েছেন। তাহলে এই ম্যাচে একটা ওভারও কেনো করলেন না? এমন পরিস্থিতি হলে তো দলে কোনো অপশন না থাকলে মুশফিককে দিয়েও ২/১ ওভার করানো যায়, সেখানে অপশন তো ছিলো আমাদের। ব্যাটসম্যানের জন্য নতুন কিছু আনা যেত না কি?

মাঠের বাইরে থাকা সাকিব আল হাসান পরামর্শ দিচ্ছেন অধিনায়ককে

আসা যাক সবথেকে বিতর্কিত বিষয়ে, যার মুখোমুখি তিনি বেশি হয়েছেন। রিভিউ নেয়ায় কার্পন্য করা। এখানে লিটনের দোষ দিতে চাইবেন অনেকে, বোলারেরও দোষ আছে। তবে সিদ্ধান্তটা মুমিনুলের। এশিয়ার মাটিতে ৪র্থ ইনিংসে যেখানে আজ পর্যন্ত কেউ ২০০ করার স্বপ্নও দেখতে পারেনি, সেখানে করে দেখিয়েছেন অভিষিক্ত মায়ার্স। এই মায়ার্স আউট ছিলেন অনেক আগেই। অন্য ব্যাটসম্যানও আউট হতে পারতেন রিভিউ নিলেই। দলের তথাকথিত জুনিয়র লিটন উইকেটের পেছনে চুপ মেরে বসে থাকেন; রিভিউ নেবে কি নেবে না তাতে যেন তার কোনো ভূমিকাই নেই। বোলার হয়তো সাহস করে “নিতেই হবে” বলতে পারছেন না, দায়িত্বটাতো মুমিনুলের। তাসকিনের বলে তাসকিনের শিউর মতামত ছাড়া মাশরাফি রিভিউ নিয়ে বাটলারের উইকেট নিয়েছিলেন, উইন্ডিজের সাথেও আগে একবার টেস্টে সাকিবকেও দেখা গেছে আত্মবিশ্বাসের সাথে রিভিউ নিয়ে রিভিউ জিততে। প্রশ্নটা উঠতেই পারে, “মুমিনুলের এই আত্মবিশ্বাস কোথায়?” উত্তরটাও যে কেউ এসে দিতে পারেন, “প্রথম ইনিংসে সাদমানের আউটের পর মুশির আত্মবিশ্বাস কোথায় ছিলো? মুমিনুল তো আরও জুনিয়র। “

দিনশেষে দোষটা মুমিনুলের একার না, তবে মুমিনুলেরই বেশি। ফিল্ডিং পজিশন সেট করার ক্ষেত্রে তার অপরিপক্বতা নিয়ে আর কি ই বা বলার আছে? ব্যাটসম্যান মুমিনুলকে কেউ ১০ এ ১০ দিলেও ক্যাপ্টেন মুমিনুলকে কত দিতে পারবেন জানিনা। আর আমাদের বোলাররা? ক্যাপ্টেন কিছু বলে না তাই বলে তাইজুলও অন্তত ক্যাপ্টেনকে কিছু বলবে না? বোলাররা আসছেন, কোনো পরিকল্পনা ছাড়া বল করছেন, ব্যাটসম্যান স্বাচ্ছন্দে খেলছেন আর ফিল্ডার-বোলাররা মিলে হাসছেন। এটাই ছিলো সবথেকে আফসোস করার মতো দৃশ্য। ক্যাচ মিস নিয়ে আর কি বলব? কত বলা যায়? মুমিনুলকে বলীর পাঠা বানিয়ে লাভ নেই, পুরো সিস্টেমটাই খারাপ। গাছের গোড়া ছাগলে খায় নাকি গরুতে সেদিকে নজর না দিয়ে নজর যদি পাতাকে আরও সুন্দর করার দিকে থাকে, তবে বারবার এমনটা ঘটাই স্বাভাবিক।

ক্যাপ্টেন হিসেবে মুমিনুলের ৫ ম্যাচের একটিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জিতেছে বাংলাদেশ, বাকি সব হার। মুমিনুলের আছে ২ টি শতক, শূন্য রানে আউটও হয়েছেন ২ বার। গড়টা ৪৩.১১।

আপাতত এখানেই শেষ!

মতামত জানান :