২৫শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

“পঞ্চাশ থেকে একশ”- মাঝের দূরত্বটা এতো বেশি কেন?

প্রতিবেদক
Rabiul Islam Shakib
বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি , ২০২১ ১:১২

অর্ধশতক, শতক, দ্বিশতক: ব্যাটসম্যানদের জন্য মাইলফলক এগুলো। ব্যাটসম্যানরা দলের প্রয়োজন মাথায় রেখে নিজেদের ইনিংসকে যতদূর নিয়ে যেতে পারেন ততই মঙ্গল। কিন্তু … …

৫ মার্চ ২০১৫। বিশ্বকাপের ২৭ তম ম্যাচ, মুখোমুখি বাংলাদেশ আর স্কটল্যান্ড। রুবেল, মাশরাফির ইকোনোমি সেদিন ৭.৫০ করে দিয়ে স্কটল্যান্ড তুলে ফেললো ৩১৮ রান। ৩১৯ রানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাটিং-এ। ওপেনে তামিম ইকবাল আর সৌম্য সরকার। বিশ্বকাপে প্রথম সেঞ্চুরি করবেন বলে ঘোষণা দিয়ে গিয়েছিলেন তামিম; সেদিন সেই কথা রাখার কাছাকাছি পৌঁছে গেছিলেন তিনি। ৫০ পেরিয়ে ৬০, ৬০ পেরিয়ে ৭০, এরপর ৮০, ৮৫, ৯০। প্রতিটি ধাপেই সমর্থকদের স্বপ্ন মেলছিলো ডালপালা। ৯০ পার করা তামিমের খেলা প্রতিটা বলের সাথে সমর্থকের আত্মা কেঁপে উঠা, চোখে-মুখে স্বপ্ন, সাথে দুশ্চিন্তাও। সেই দুশ্চিন্তাটাকেই বাস্তবতা বানিয়ে ৯৫ রানে লেগ বিফোরে কাঁটা পরে হয়েছিলো স্বপ্নভঙ্গ। একদিনের ক্রিকেটে ৭৫ থেকে ৯৯ রানের মধ্যে তামিম ইকবাল আউট হয়েছেন এটা ছাড়াও আরও ১০ বার। যেখানে আছে অস্ট্রেলিয়া আর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আরও ২ টি ৯৫ রানের ইনিংস।

৭৫ থেকে ৯৯- এই রানের মধ্যে সাকিব আল হাসান টেস্ট ক্রিকেটে আউট হয়েছেন ৯ বার, পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটে মুশফিকুর রহিম আউট হয়েছেন ১২ বার। ওডিআই-টি২০-টেস্ট, ক্রিকেটের ৩ সংস্করণ মিলিয়ে তামিম ইকবাল আউট হয়েছেন ১৯ বার।

৫০ থেকে ৯৯- এই রানের মধ্যে টেস্ট ক্রিকেটে তামিম ইকবাল আউট হয়েছেন ২৮ বার, একদিনের ক্রিকেটে তামিম ৪৫ বার আর সাকিব ৪০ বার, টুয়েন্টি-টুয়েন্টিতে সাকিব আল হাসান আউট হয়েছেন ৬ বার।

৭৫-৯৯ এর মধ্যে আউট হওয়ার ইনিংগুলোর অর্ধেককেও যদি ১০০ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারতেন সাকিব, তামিম, মুশফিক; তবে তাদের ক্যারিয়ারে শতকের সংখ্যা আরও কত বাড়তো সেটা ভাবতে পারছেন? আপনাদের সুবিদার্থে না হয় আলাদা আলাদা করেই ৩ জনকে নিয়ে আলোচনা করা যাক।

তামিম ইকবাল:

তামিম ইকবালের টেস্ট শতক ৯ টি আর অর্ধশতকের সংখ্যাটা ২৮। টেস্ট ক্রিকেটে ৭৫ থেকে ৯৯ রানের মধ্যে তিনি আউট হয়েছেন মোট ৮ বার। সমান ৮ বার আউট হয়েছিলেন হাবিবুল বাশারও, সে আপাতত যাক। এই ৮ বারের মধ্যে তার ৮০ এর উপরের ইনিংস আছে ৬ টি। যদি এখান থেকে ৪ টিকেও তিন অংকের ম্যাজিক ফিগার পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারতেন তবেই তার শতকের সংখ্যা থাকতো ১৩ টি। আর যদি ৫০ থেকে ৯৯ এর মধ্যে আউট হওয়া ২৮ ইনিংস থেকে ১০ টিকেও শতকে রূপ দিতে পারতেন তবে শতক থাকতো ১৯ টি। কেমন হতো তখন ব্যাপারটা? ভেবে দেখুনতো একবার!

এ তো গেলো টেস্ট ক্রিকেট। একদিনের ক্রিকেটে তামিম ইকবালের শতক আর অর্ধশতকের মাঝের পার্থক্যটা ৩৬ এর। ৪৯ অর্ধশতকের বিপরীতে শতক মাত্র ১৩ টি। ৭৫ থেকে ৯৯ এর মধ্যে আউট হওয়া ১১ ইনিংসের মধ্যে ৫ টিকে শতক পর্যন্ত নিতে পারলে তার শতকের সংখ্যা হতো এই ফরমেটে ১৮। ৫০ থেকে ৯৯ এর মধ্যে আউট হওয়া ৪৫ ইনিংসের প্রায় অর্ধেকেরও অর্ধেক ১২ টি ইনিংসকে শতকে রূপ দিতে পারলো সংখ্যাটা হতো একেবারে ২৫।

সাকিব আল হাসান:

সাকিব আল হাসানের টেস্ট অর্ধশতক ২৫ টি হলেও শতক কিন্তু মাত্র ৫ টি। একদিনের ক্রিকেটেও ৪৮ অর্ধশতকের বিপরীতে শতক আছে মাত্র ৯ টি। অথচ তিনিও ওডিআইতে ৭৫ থেকে ৯৯ এর মধ্যে আউট হয়েছেন ৬ বার, যার মধ্যে আছে একটি ৯৭ রানের ইনিংস। টেস্টে ৯৬ রানে দুইবার সাথে ৯৭ রানে আউট একবার। ৮০ থেকে ৯৯ এর মধ্যে আউট হয়েছেন ৯ বার। ৫০+ করে ১০০ এর আগে প্যাভিলিয়নে ফিরতে হয়েছে মোট ২১ বার। কনভারশন রেটটা আর একটু বেশি হলে সাকিব আল হাসানের জন্য তা কতটা ভালো হতো ভাবতে পারছেন?

মুশফিকুর রহিম:

মুশফিকুর রহিমের টেস্ট শতক ৭, অর্ধশতক ২২, ওডিআইতেও শতক মাত্র ৭ যেখানে অর্ধশতক ৩৯। অথচ টেস্ট ক্রিকেটে মুশফিক ৬০ থেকে ৯৯ এর মধ্যে ফিরেছেন মোট ১৯ বার। এই ১৯ বারের মধ্যে ৭ বার ফিরেছেন ৭৫ বা ৭৫ এর উপরে গিয়ে। একদিনের ক্রিকেটে ৭৫ থেকে ৯৯ এ ১২ বার আর ৬০ থেকে ৯৯ এর মধ্যে ২৭ বার আউট হয়ে গ্লাভস খুলতে হয়েছে মুশফিককে।

শুধু এই ৩ জন না, বাংলাদেশ ক্রিকেটের আরও অনেক ব্যাটসম্যানদেরই এই একই সমস্যা। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের ওডিআই শতক ৩ আর অর্ধশতক ২২। ব্যাটিং পজিশন এখানে বাধাঁ হলেও টেস্ট ক্রিকেটের ৪ আর ১৬ এর ক্ষেত্রে বাঁধাটা কে? সৌম্য সরকারের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের সেই আগুনে একেকটা ইনিংসের পরো ১১ অর্ধশতকের সাথে শতক ২ টি। অবশ্য ৮০ এর উপরে গিয়ে নট আউট ছিলেন ২ বার, আউটও হয়েছেন ২ বার।

এদিক থেকে বর্তমান সময়ে অনেক এগিয়ে মুমিনুল হক। টেস্টে শতক আর অর্ধশতকের সংখ্যা ১০ আর ১৩। হোম ট্র্যাক বুলি শব্দটাকে সামনে নিয়ে আসলে সেখানে সবগুলো শতকের বিপরীতে অর্ধশতক ৭ টি। আশরাফুলের ৬ টেস্ট শতকের বিপরীতে অর্ধশতক ৮ টি। ইমরুল কায়েসের বেলাতেও সংখ্যাটা ৩ আর ৪। সাকিব-মুশফিক-তামিমের সাথে তাদের তুলনা দিচ্ছি না; তবে নিজেদের ওই ইনিংসগুলোকে আরেকটু সামনে নিয়ে যেতে পারলে ক্যারিয়ার শেষে নিজেদের পরিসংখ্যান দেখে হাসতে পারতেন খানিকটা বেশি। নয়তো টেস্টে এই আলোটা মুমিনুল ইতিমধ্যেই কেড়ে নিয়েছে; অন্যটিতেও কেউ একজন এমনভাবে চলে আসলে আজ থেকে এক যুগ পর শতক-অর্ধশতক নিয়ে তুলনা করে তাদেরকে বলতেই পারেন সাকিব-তামিম-মুশির থেকে সেরা ব্যাটসম্যান।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০০ শতকের মালিক শচীন টেন্ডুলকার ক্রিকেটের এই দুই সংস্করণে ৭৫ থেকে ৯৯ এর মধ্যে আউট হয়েছেন ৬১ বার, সাঙ্গাকারা ৪১ বার। ভিরাট কোহলি ওডিআই তে ২২ বার আউট হলেও টেস্টে হয়েছেন ৮ বার। টেস্ট ক্রিকেটে সেরা কনভারশন রেটের তালিকায় ৩ নম্বরে আছেন আরেক ভারতীয় শিখর ধাওয়ান।

স্টিভেন স্মিথের টেস্ট শতক আর অর্ধশতক ২৭ আর ৩১ টি। একদিনের ক্রিকেটে ১১ আর ২৫। রোহিত শর্মার টেস্টে ৭ আর ১২, ওডিআই তে ২৯ আর ৪৩। বাবর আজমের ক্ষেত্রে সংখ্যাগুলো ৫,১৬ আর ১২, ১৬। আমাদের দেশের সেরা ব্যাটসম্যানদের বেলায় তাহলে পঞ্চাশ আর একশ-এর মধ্যের দূরত্বটা তবে এতো বেশি কেন? সাকিব-তামিম-মুশফিকরা অন্তত তাদের শেষ বেলায় এসেও একটু পরিবর্তন করবেন নিজেদের? উত্তরটার জন্য আপাতত অপেক্ষাটা তাদের ক্যারিয়ার সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত। পশ্চিমে হেলে পড়া ক্যারিয়ারের শেষটা আরও একটু বেশি বর্ণিল করুক, এটাই হয়তো চাবে সমর্থকরা; তবে তারা ভালোভাবে চাইলেই হলো।

মতামত জানান :