২৫শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

১৬ ও ১৭ই মার্চ ২০০৭: রানার প্রস্থান ও ‘ধরে দিবানি’র গল্প

প্রতিবেদক
Rabiul Islam Shakib
মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ , ২০২১ ১২:১৫

ক্রিকেট, অনেকের কাছে শুধু একটি খেলার নাম হলেও বিশ্বের এই প্রান্তের মানুষের কাছে অনেকটা অমৃতের মতোই। বিভিন্ন বিষয়ে সমস্ত দেশের মানুষ যখন বিভিন্ন পক্ষে বিপক্ষে অংশ থেকে অংশাংশতে ভাগ হয়ে যায়, তখন এই ক্রিকেটটাই কাজ করে সবাইকে এক করার অমোঘ অস্ত্র হিসেবে। ‘নানা মুনির নানা মত’ থাকবেই, তবে ভীনদেশের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে দেশের প্রত্যেকের মাঝেই যেন বাজে এক ঐক্যের জয়গান, এক ঐকতানের সুর। কথায়, যুক্তিতে, তর্কে নিজ দলকে অদ্রিশিখর উচ্চতায় তুলে নেয়ার এক অনিরুদ্ধ নৈকষ্য প্রচেষ্টা থাকে পৃথিবীর এই অংশের প্রায় প্রত্যেক ক্রিকেট প্রেমীর মাঝেই।

এই ক্রিকেটের পথচলার প্রারম্ভটা আজকের না। প্রায় ১৩০ বছরের পুরোনো এই ক্রিকেটের সাথে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সম্পর্কটা মোটামুটি ৩৪ বছরের। উপমহাদেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের লাল সবুজের এই ছোট দেশটির ৩ দশকের বেশি সময় ধরে চলা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসে আছে অনেক যোগ বিয়োগের গল্প। ফারুক আহমেদের রক্তাক্ত মাথা নিয়ে ব্যাটিং করাটা যেমন প্রাপ্তি, ২০১২ এর এশিয়া কাপের ফাইনালে ছুঁতে ছুঁতে বিজয়ীর ট্রফিটা না ছুঁতে পারাটা তেমনি বেদনার নীল রঙে মোড়ানো। এমনি যোগ আর বিয়োগকে সাথে নিয়েই ঋদ্ধ হচ্ছে আমাদের ক্রিকেট ইতিহাস। তবে একই সাথে যোগের আনন্দ আর বিয়োগের কষ্টও কি আস্বাদন করা যায়?  

শিরোনামের তারিখ থেকে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাতে শুরু করলে পেরিয়ে যাবে ১৬৮ টি মাস। এই ১৬৮ মাসে প্রাইমারি স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে হাই স্কুল হয়ে কলেজ শেষ করে আজ আছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যম্পাসে, এই ১৬৮ মাসে মহাকাশে স্যাটেলাইট, পদ্মার বুকে বিশাল সেতুর সাথে নিজ দেশ থেকে বিতারিত রোহিঙ্গাদেরকেও দেখেছি আমাদের দেশে, এই ১৬৮ মাসে বিশ্বকাপ ট্রফি হয়েছে বারবার হাতবদল, পেয়েছে নতুন চ্যাম্পিয়নদের হাতের ছোঁয়া, উনিশের হাত ধরে লাল সবুজের কেতন উড়িয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছি আমরাও।

গাণিতিক হিসাবনিকাশে গেলে ১৬৮ মাস সময়টা অনেক, কোনো কষ্ট ভুলে যাওয়ার জন্য তো অবশ্যই, অনেক সুখস্মৃতিও ঠিকঠাকভাবে মনে পড়ার কথা না এতোদিন বাদে। বদলে যাওয়ার স্রোতে ভেসে ২০২১-এ এসে ১৪ বছর আগের কোনো কথা না ভুলে যাওয়াটাই হয়তোবা অস্বাভাবিক ঠেকতে পারে মানব মস্তিষ্কে। তবে সব কিছু তো আর ভুলে যাওয়া যায়না৷ কিছু ব্যাথা, কিছু শোক, কিছু শক্তি আর কিছু জয়ের গল্প মনের ভেতর পেয়ে যায় অমৃতরসের সন্ধান, সেখান থেকে যে তারা একপা-ও এদিক ওদিক যেতে চায় না, যেতে পারে না। ক্রিকেটকে সঞ্জীবনী সুধা মনে করা বাঙালির জন্য তেমনই কান্না-হাসির দুটো তারিখ ১৬ আর ১৭ই মার্চ ২০০৭।

[১৬ মার্চ ২০০৭]

শীতের বুড়ির রুক্ষতা তখন প্রায় শেষের পথে। বসন্ত এসে গেছে মাসখানেক আগেই। প্রকৃতি সাজছিলো কৃষ্ণচূড়ার রঙে। ফাল্গুন সবে মাত্র বিদায় নিলো বাঙালির উঠোন থেকে, তবে বসন্ত তখনো রয়ে গেছে। কোকিলের ডাক শুনে ঘুম ভাঙা বাঙালির এই দিনটা অন্তত বাকি ৮/১০ টা বসন্তের দিনের মতো করে শুরু হয়নি৷ রাত পার হলেই বিশ্বকাপ মঞ্চে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ। দিনের শুরুটা হয়েছিলো নয়া বসন্ত লেখার আমেজে আর রোমাঞ্চে। তবে দিনের শেষটায় সেই রোমাঞ্চ যে আর রইবে না তা তো ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এদেশে কেউ ঘূর্ণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি। “বাতাসেরও কান আছে”, খারাপ সংবাদ গুলো বাতাসে ভেসে দ্রুতই ছড়িয়ে যায় দিগ্বিদিক। তেমনি করে মূহুর্তেই খুলনা থেকে হাওয়ায় ভেসে সারাদেশে ছড়িয়ে গেলো ২২ বছর বয়সী এক রক্ত টগবগে হই হই যুবক, সম্ভাবনাময় অলরাউন্ডার, দেশের ইতিহাসের প্রথম ওডিআই সিরিজ জেতানোর নায়কদের একজন “মানজারুল ইসলাম রানা আর নেই”। ২২ বছর বয়সেই ২২ গজের মায়াভরা দুনিয়া ছেড়ে পাড়ি দিলেন অনন্তকালের পানে।

রানার ক্রিকেটে আসাটা খুব বেশি পুরোনো হয়নি ততদিনেও। এইতো তখন থেকে মাত্র ৭ বছর আগে ২০০০ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেন রানা। ২০০৩ এই গায়ে জড়িয়ে নেন লাল-সবুজের জার্সি, করবেন দেশের প্রতিনিধিত্ব।

মোহাম্মদ রফিকের স্থলাভিষিক্ত হয়ে মাঠে নেমে নিজের ৩য় বলেই তুলে নেন ইংলিশ ব্যাটসম্যান মাইকেল ভনের উইকেট। ক্যারিয়ারের স্বপ্নীল সূচনা। প্রদীপ্ত এক স্বাপ্নিক যুবক হতে অনেকের জন্য এটুকুই যথেষ্ট। ২০০৪ এর ১৯ ফেব্রুয়ারি মাঠে নামেন সাদা পোশাকে। সেই রানাই আজ চলে গেলো সব ছেড়ে, ৯৬ নং জার্সিটা গায়ে জড়িয়ে আর মাঠে নামা হবে না সেরাদের সেরা হওয়ার প্রতিযোগিতায়। মাশরাফি বিন মর্তুজা, সৈয়দ রাসেল, মুরাদ খান, আব্দুর রাজ্জাক আজ থেকে আর আড্ডায় পাবেন না ঠোটের কোণে সদা হাসি লেগে থাকা প্রাণশক্তিকে ভরপুর রানাকে।

মাশরাফি, আব্দুর রাজ্জাক, সৈয়দ রাসেলরা তখন বিশ্বকাপ খেলতে ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জে। অন্য সব ক্রিকেটারের মতোই রানারও স্বপ্ন ছিলো বিশ্বকাপ মঞ্চে দেশের হয়ে নামার। কিছু স্বপ্ন ধরা দেয় না কখনো, স্বপ্ন হয়েই থেকে যায়, বারবার পীড়া দেয়। তবে রানা হয়তো সেই পীড়া নিতেই অস্বীকৃতি জানান, চলেই গেলেন বাইশ গজের ভুবন ছেড়ে অন্য এক ভুবনে, যেখান থেকে কেউ কোনোদিন ফিরে আসে না।

তরুণ সাকিবের আগমণে বিশ্বকাপ দলে জায়গা হলো না রানার। দল থেকে অবশ্য ছিটকে গিয়েছিলেন কেনিয়া সিরিজের পরই। ২০০৫ এ দলের প্রাণ হয়ে থাকা রানা ’০৬ থেকেই ফর্মহীনতার দিকে যাচ্ছিলো। ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জে যাওয়া না হলেও ‘এ’ দলের হয়ে যাওয়ার কথা ছিলো শ্রীলঙ্কাতে। তবে ভাগ্যই হয়তো তাকে রেখে দিয়েছিলো মাতৃভূমিতে, বাংলাদেশে, খুলনাতে; শেষটা যে তার এখানেই ছিলো।

রানা সেবার জাতীয় লিগে খুলনার অধিনায়ক। অধিনায়কত্বের দায়িত্ব চুকিয়ে ফিরে আসলেন খুলনায়। খেলতে গেলেন স্থানীয় একটা টুর্নামেন্টে৷ জীবনের শেষ ম্যাচেও ম্যান অব দ্যা ম্যাচ রানা; জীবনের শেষ ইনিংসে ছিলেন নট আউটও৷ অপর প্রান্তে নট আউট থাকা নুরুল হাসান সোহান এখনো ২২ গজে থাকলেও রানা যে অপরাজিত থেকেই চলে গেছেন ব্যাটপ্যাডের দুনিয়া ছেড়ে বহুদূরে।

জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মানজারুল ইসলাম রানা

স্থানীয় টুর্নামেন্টের ম্যাচ শেষ করে খাওয়ার ইচ্ছে হলো আব্বাসের চুইঝাল৷ ম্যাচ শেষে সেতু, শাওন আর সেলিমকে নিয়ে দুটো বাইকে করে যাত্রা চুকনগররের দিকে৷ চুকনগরের চুইঝাল খেয়ে তবেই ফিরবেন বাড়ি। শুরুতে রানার বাইকে সেতু না থাকলেও কিছুদূর যাওয়ার পর সেতুকে নিজের বাইকে নিলেন রানা, মৃত্যুটা যে একই সাথে লেখা ছিলো দুজনের। চুকনগরে আর যাওয়া হলো না, ওপারে যাওয়ার বড্ড তাড়াহুড়ো ছিলো হয়তো; পথেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক মাইক্রোবাসের সাথে ধাক্কা, তারপর ইলেকট্রিক পোলে। অনিশ্চয়তা আর উৎকন্ঠা নিয়ে সেলিম আর শাওন দ্রুত এসে রানা আর তার ক্লাব সতীর্থ সেতুকে পেলেন বটে, তবে দেহ দুটো রক্তাক্ত আর আত্মাটা ততক্ষণে দেহঘড়ি ছেড়ে চলে গেছে মৃত্যুর দূতের হাতে। খুলনার রাস্তা রক্তে রঙিন করে চলে গেলেন রানা। চলে যাওয়ার সময়ও রেকর্ড গড়ে গেলেন। যে রেকর্ড চায়নি কেউই, যে রেকর্ড গর্বের না, আনন্দের না; এই রেকর্ড শুধুই কাঁদায়। সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট খেলোয়ার হিসেবে আর্চি জ্যাকসনের ৭০ বছর আগে গড়া সেই বেদনার রেকর্ড ভেঙে এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে অবিনশ্বরের দিকে যাত্রা করলেন অলরাউন্ডার মানজারুল ইসলাম রানা।

মাশরাফিরা তখন ছক আঁকছিলো বাংলাদেশ থেকে বহুদূরে পরেরদিন পোর্ট অব স্পেইনে ভারতকে হারানোর। এখনকার মতো ভারত বাংলাদেশ দ্বৈরথটা তখন হয়তো ছিলো না, তবে রোমাঞ্চ কম কিসে? তার মধ্যেই হঠাৎ করে এমন একটা সংবাদ শুনতে কেউই প্রস্তুত ছিলো না। থাকার কথাও না৷ যে মাশরাফির খুব কাছের বন্ধু ছিলো রানা, সেই রানার বিদায়ের খবরটা মাশরাফিই জানলেন সবার পরে। শুনে বলে উঠলেন, “রানা, এটা কি করলি”!

দলের অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের কাছেই সবার আগে পৌঁছায় সংবাদ৷ বুকে শোক নিয়ে নিজেকে শক্ত করে খবরটা জানিয়ে দিলেন বাকিদেরও। ভারতের সাথে খেলতে নামার জন্য ছককষা থেমে গেলো আচমকা৷ কেউ ঘুমাতে পারেনি সেদিন। নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সকালে ম্যাচ। ঘুরে তো দাঁড়াতেই হবে, শোকে ভেঙে পড়লে চলবে না, শক্ত করতে হবে নিজেদের, জিততে হবে ম্যাচ। রানার জন্য জিততেই হবে, মাঠে কাল বাংলাদেশ দলের খেলোয়ার সংখ্যা ১১ হবে না, রানার নামটাও যুক্ত হবে।

[১৭ মার্চ ২০০৭]

শোককে বাঙালি শক্তিতে পরিণত করতে পারে। সেদিন যেমন দেখিয়েছিলো তামিম-মাশরাফিরা, আজও তা দেখিয়ে যায় আকবরেরা। রানার জন্য মাঠে দুই দলের খেলোয়ারদের নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ম্যাচ। টস জিতে ব্যাটিং এ ভারত ৷ বোলিং পেয়ে অখুশি হওয়ার কিছুই ছিলো না মাশরাফিদের। আগের দিন মাশরাফি বলেছিলেনই, “উইকেট যদি একটু ভেজা থাকে আর আমরা যদি আগে বোলিং করি, তাহলে ধরে দিবানি”।

ধরে দেওয়ার শুরুটাও হলো ১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাট তাপমাত্রার জ্বর নিয়ে খেলতে নামা মাশরাফির হাত ধরেই, ২ রান করা শেবাগকে ফিরিয়ে। রবিন উথাপার উইকেটটাও নিয়ে নেন ম্যাশ৷ আব্দুর রাজ্জাক, মোহাম্মদ রফিকও চেপে ধরেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের। ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের তখন দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম, চোখে মুখে উৎকন্ঠা তাদের সমর্থকদের। একে একে সবাই যখন আসা যাওয়ায় ব্যস্ত তখন প্রতিরোধ গড়তে চাওয়া গাঙ্গুলিকে মোহাম্মদ রফিক আর যুবরাজকে প্যাভিলিয়নে পাঠান আব্দুর রাজ্জাক। তাদের দুজনের তিনটি করে মোট ৬ আর মাশরাফির ৪ উইকেটে ৫০ ওভারও খেলতে পারেনি পূর্ণশক্তির ভারত। অলআউট ১৯১ রানে।

২০০৭ বিশ্বকাপে ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচের একটি ছবি

মানজারুল ইসলাম রানার জন্য জিতবে বাংলাদেশ৷ সে জয়ে সবার সমান অবদান না থাকলে কিভাবে হয়? অভিজ্ঞ আর নতুনেরা যেন ভাগাভাগি করে নিলো দায়িত্ব। বোলিং এ দায়িত্বটা সামলান অভিজ্ঞরা, আর ব্যাটিং এ সাকিব-তামিম-মুশফিক ত্রয়ী যারা তখনো বাংলাদেশ দলে একেবারেই নতুন।

শুরুটা তামিমের ব্যাট থেকে ধ্রুপদীর মতো করে৷ শুরু থেকেই হেসে খেলে খেলা একেকটা কাভারড্রাইভ যেন বাঙালির চোখ-মন-আত্মার প্রশান্তি এনে দেয়ার চেষ্টায় ব্যাস্ত ছিলো। শাহরিয়ার নাফিস দ্রুত ফিরে গেলেও ১৭ বছর বয়সী তামিম ইকবাল চটে বসলেন ভারতীয় বাঘা বাঘা বোলারদের বিপক্ষে। দলের স্কোর যখন ১ উইকেটে ২৭, তখন জহির খানের করা এক বাউন্সারে খানিকটা আঘাতপ্রাপ্ত হয় তামিম। ওই অতটুকুই; বাকি গল্পটুকু তামিমের ডাউন দ্যা ট্র্যাকে এসে হাকানো এক-একটা বাউন্ডারির গল্প, গল্পটা জহির খানের বলকে গ্যালারির দোতলা স্পর্ষ করানোর গল্প, গল্পটা জহির খান ছাপিয়ে পুরো ভারতের মানুষের বুকের জ্বালার গল্প, গল্পটা মানজারুল ইসলাম রানার জন্য লাল সবুজের এই ছোট দেশের সকল সমর্থকদের প্রার্থনাকে সাথে নিয়ে জেতার গল্প। গল্পটা কন্ঠযোদ্ধা আতহার আলি খানের মাইক্রোফোন হাতে হাসির গল্পও বটে।

৭ চার আর ২ ছয়ে ৫৩ বলে ৫১ রানের দারুন এক শুরু এনে দিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান তামিম। ভারতীয়দের মনের কফিনে প্রথম পেরেকটা ততক্ষণে গেঁথে গেছে। বাকি দায়িত্বটা নিজেদের হাতে তুলে নেন অন্য দুই কিশোর মুশফিক আর সাকিব। ৮৬ বলে ৫৩ রানের এক দায়িত্বশীল ইনিংস খেলে সাকিব ফিরলেও আশরাফুলকে নিয়ে নতুন রূপকথা লিখেই মাঠ ছাড়েন মুশফিকুর রহিম। ৫ উইকেটের বিশাল জয় পেলো বাংলাদেশ। রচনা হলো নতুন মহাকাব্য। ’৯৭ এর আইসিসি ট্রফি জয়, ’৯৯ এর বিশ্ব আসরে পাকিস্তানকে হারানো, পরের বছরই টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া, কার্ডিফের মহাকাব্যিক জয়ের পর বড় সাফল্যের ডানায় যুক্ত হলো আরও এক রঙিন পালক।

ম্যাচ শেষ করে জয়ের হাসি নিয়ে ফিরছে মুশফিক ও আশরাফুল

বিশ্বকাপের আগে বাশারকে রানা বলেছিলো, “সুমন ভাই, একটা ম্যাচ কিন্তু জিততেই হবে”৷ জয়টা আসলো, কিন্তু রানা নেই, দেখে যেতে পারলো না বিশ্বকাপে জয়ের ম্যাচটা, ভারতের মতো দলকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে ফেলার ম্যাচটা।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে রানাকে নিয়ে খুব একটা গর্ব করার ফুসরত পাওয়া যাবে না৷ পরিসংখ্যান কখনোই সত্য বলে না। ১১ টেস্ট ইনিংসে ২৫৭ রান, গড় ২৫.৭০ আর মোট ১২৪.৫ ওভার বল করে নেয়া ৫ উইকেট আছে রানার নামের পাশে। তার থেকে ওডিআই ক্যারিয়ারটা কিছুটা আশাজাগানিয়া ছিলো। ২১ ইনিংসে ব্যাট করে ২০.৬৮ গড়ে ৩৩১ রান। ২৩ ইনিংসে বল হাতে নিয়ে উইকেট সংখ্যাও ২৩। এই পরিসংখ্যান কখনো বুঝাতে পারবে না ২-০ তে পিছিয়ে গিয়েও ৩-২ এ দেশের ইতিহাসে প্রথম ওডিআই সিরিজ জেতাতে কতটা ভূমিকা রেখেছিলেন রানা৷ জয়ের ৩ ম্যাচের ২ ম্যাচেই ম্যান অব দ্যা ম্যাচও বুঝাতে পারবে না তা৷

তবে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আইসিসির বর্ষসেরা উদীয়মান ক্রিকেটারের তালিকায় থাকাটা হয়তো কিছুটা হলেও প্রকাশ করবে তার যোগ্যতা৷ সেই তালিকায় থাকা কেভিন পিটারসেন, ইয়ান বেল, গৌতম গম্ভীর আর এ বি ডি ভিলিয়ার্সরা যখন সেরাদের সেরার কাতারে তখন মানজারুল ইসলাম রানা এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে দূর থেকেও বহু দূরে, অনন্ত অসীমকালের ভুবনে নতুন জীবনের যাত্রায় অনেকদিন পারও করে ফেলেছেন৷ সৃষ্টিকর্তার কাছে এখনো বাঙালিরা দোয়া করে যান ওপারে যেন তিনি ভালো থাকেন।

সেরা উদীয়মান ক্রিকেটারের তালিকায় মানজারুল রানা

কিছু শোক আর শোককে শক্তি বানিয়ে নিয়ে পাওয়া বিজয়ের গল্প মানুষ ভুলতে পারে না, ভুলতে পারেনি ২০০৭ এর সেই দুদিনের কথাও। সেদিন ভারতকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দেয়া, সবশেষ দশকে ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকাকে টানা একদিনের ম্যাচের সিরিজে হারানো, ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়াকে টেস্ট হারানো কিংবা দেশের শততম টেস্টে জয় বা আন্তর্জাতিক সহস্রতম টিটোয়েন্টিতে ভারতকে হারিয়ে যে ছোট ছোট স্বপ্ন দেখিয়েছে দল, সেই প্রত্যেকটি স্বপ্নের বিপরীতে কিছু মানুষ মনে রেখেছিলো রানাদের। সেই সব স্বপ্ন মিলে একদিন এক হয়ে উড়াল দিলো আকাশে, আকাশসম স্বপ্ন ছুঁতে, আকাশসম স্বপ্ন ছুঁয়েও নিলো, উনিশের হাত ধরে বিশ্বকাপটা এখন বাংলাদেশের, লাল-সবুজেরা এখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। এই বিশাল আনন্দে যেদিন ভাসছিলো গোটা দেশ, সেদিনও কিছু মানুষ স্মৃতির কপাটে আঘাত করে স্মৃতি হাতরে আপন করে নিয়েছিলো সেদিনের সেই কালো কালিতে লেখা ইতিহাসকে।

এভাবেই একদিন বড়রাও বিশ্বকাপ জিতবে, ইদ আর পূজোয় নুন আনতে পানতা ফুরোনো ভ্যালচালকের ছেলে থেকে ধনীর একমাত্র আদরের সন্তানটিও একদিন নতুন জামার বদলে বায়না ধরবে বাঘের লগোর উপরে একটা তারকা আঁকা লাল সবুজের জার্সিটা কিনে দেয়ার জন্য, সেদিনও এক দল মানুষ মনে রাখবে সেই নামটা, মানজারুল ইসলাম রানার নামটা। যুগের পর যুগ মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকবেন মানজারুল ইসলাম রানারা৷ হয়তো শতকের পর শতক ধরেও বেচে থাকবেন জনশ্রুত কিংবদন্তী হয়ে, হয়তো তখনকার সেই রোবোটিক পৃথিবীতেও আনন্দ-বেদনা মেলানো অদ্ভুত গল্পের তালিকায় এই গল্প থাকবে উপরের সাড়িতেই। সাথে অমলিন হয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে রইবে খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের ‘মানজারুল ইসলাম রানা স্ট্যান্ড’।

,

মতামত জানান :